ডোপামিন নেশন: সস্তা আনন্দের চড়া মূল্য এবং ভারসাম্যের পথ
কয়েক মাস আগেই ড. আন্না লেম্বকের ডোপামিন নেশন বইটি পড়েছিলাম। তখন থেকেই ভাবছিলাম আমার ব্যক্তিগত ব্লগে এটি নিয়ে কিছু লিখবো। সেই সময় আমার ডায়েরিতে বেশ কিছু কথা অগোছালোভাবে নোট করে রেখেছিলাম। গতকাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৫ দিনের একটি দীর্ঘ ছুটি দিলো। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণত এত লম্বা ছুটি কখনোই দেয় না। এই অবসরের সুযোগে ডায়েরির সেই অগোছালো চিন্তাগুলো গুছিয়ে আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করছি। বইটি পড়তে গিয়ে আমি এমন কিছু সত্য জানলাম যা আমাদের প্রত্যেকের জানা প্রয়োজন। বিশেষ করে আমাদের বর্তমান প্রজন্মের জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়। আমার পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে যা শিখলাম, তা আপনাদের সাথে সহজভাবে নিচে তুলে ধরা হলো।
আমাদের মস্তিষ্ক খুব অদ্ভুতভাবে কাজ
করে। আমরা যখন কোনো কিছু থেকে আনন্দ পাই, যেমন প্রিয় কোনো খাবার খাওয়া, সোশ্যাল
মিডিয়ায় একটা লাইক পাওয়া কিংবা কোনো ড্রাগস গ্রহণ করা, তখন আমাদের মস্তিষ্কে
ডোপামিন নামক একটি রাসায়নিক পদার্থ নির্গত হয়। ড. লেম্বকে বুঝিয়েছেন যে, আমাদের
মস্তিষ্কে সুখ এবং বেদনা অনুভব করার জায়গাটি আসলে একই। এটি অনেকটা আমাদের ছোটবেলার
পার্কের সি স (teeter-totter) বা তুলাদন্ডের মতো কাজ করে।
বইটিতে একটি চমৎকার উদাহরণ দেওয়া
হয়েছে। কল্পনা করুন, আপনার মস্তিষ্কের পাল্লায় যখন আনন্দের পাল্লা ভারি হয়, তখন
কিছু ছোট ছোট দানব বা গ্রেমলিন (Gremlins) দৌড়ে এসে বেদনার পাল্লায় গিয়ে বসে পড়ে
যাতে ভারসাম্য ফিরে আসে। সমস্যাটা এখানেই শুরু হয়। এই গ্রেমলিনগুলো পাল্লাটি সমান
হওয়ার পরও সেখান থেকে নামে না। তারা আরও কিছুক্ষণ সেখানে বসে থাকে।
এর ফলে কি হয়? আপনি যখন ড্রাগ বা অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া থেকে পাওয়া সেই সাময়িক আনন্দ শেষ করেন, তখন আপনার মনে এক ধরণের শূন্যতা, অস্থিরতা বা বিষণ্ণতা তৈরি হয়। আপনি তখন খুব সাধারণ কাজেও আর আনন্দ পান না। আপনার মনে হয় যে আবার সেই আগের কাজটা করলেই ভালো লাগবে। একেই আমরা সহজ কথায় হ্যাংওভার বা কামডাউন বলি।
আমাদের বাংলাদেশের শিক্ষিত তরুণদের
মধ্যে এখন মাদকাসক্তি বা স্ক্রিন অ্যাডিকশন কেন এত বাড়ছে, তার একটা উত্তর এই বইয়ে
পাওয়া যায়। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার অনেক চাপ, ক্যারিয়ার নিয়ে
দুশ্চিন্তা এবং সামাজিক প্রত্যাশা আমাদের সবসময় মানসিক চাপের মধ্যে রাখে। এই চাপ
থেকে বাঁচতে বা একটু আনন্দ পেতে অনেক তরুণ মাদকের আশ্রয় নেয়।
শুরুতে হয়তো তারা একটু আনন্দের জন্য
এটি করে। কিন্তু চ্যাপ্টার ৩ এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, বারবার যখন ডোপামিন বাড়িয়ে
পাল্লাটি আনন্দের দিকে নেওয়া হয়, তখন মস্তিষ্কের সেই বেদনার দানব বা গ্রেমলিনগুলো
সংখ্যায় অনেক বেড়ে যায়। তারা সেখানে পাকাপাকিভাবে বাসা বেঁধে ফেলে। ফলে এক সময়
দেখা যায়, সেই ছেলেটি বা মেয়েটি আর আনন্দ পাওয়ার জন্য ড্রাগ নিচ্ছে না, বরং
স্বাভাবিক বোধ করার জন্য বা সেই অসহ্য বেদনা থেকে বাঁচতে ড্রাগ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে না পারা, সবসময়
মেজাজ খিটখিটে থাকা এবং সাধারণ জীবনকে পানসে মনে হওয়া এগুলো সবই সেই পাল্লার
ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার লক্ষণ। আমাদের ব্রেইন তখন হাই ডোপামিন বা খুব শক্তিশালী
উত্তেজনায় অভ্যস্ত হয়ে যায়, যার ফলে বাস্তব জীবনের ছোট ছোট আনন্দ আর আমাদের স্পর্শ
করতে পারে না।
শেষ কথা, আমরা আসলে একটি ডোপামিন নেশনে বাস করছি যেখানে সবকিছুই খুব
সহজে পাওয়া যায়। কিন্তু এই সহজলভ্য আনন্দই আমাদের মস্তিষ্কের ভেতরের শান্তি নষ্ট
করে দিচ্ছে। আমাদের বুঝতে হবে যে, জীবন মানে শুধু আনন্দ নয়। বেদনারও প্রয়োজন আছে।
আমরা যখন কষ্টের কাজ করি বা ধৈর্য ধরি, তখন আমাদের মস্তিষ্ক প্রাকৃতিকভাবেই
পাল্লাটিকে আনন্দের দিকে নিয়ে যায় যা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
আপনারাও কি কখনো অনুভব করেছেন যে অনেকক্ষণ ফোন চালানোর পর হঠাৎ খুব একা বা বিষণ্ণ লাগছে? এটিই হলো আপনার মস্তিষ্কের সেই গ্রেমলিনদের কারসাজি। জীবনকে কেবল সিন্যাপস বা নিউরনের হিসেবে না দেখে তার গভীরতা বা আত্মার তৃপ্তির দিকেও আমাদের নজর দেওয়া প্রয়োজন।
আশা করি এই ছোট আলোচনাটি আপনাদের ভালো
লেগেছে।
Primary Reference
Book Title: The Official Dopamine Nation Workbook: A Practical Guide to Finding Balance in the Age of Indulgence
Author: Anna Lembke, MDPublication Year: 2024
Publisher: Dutton, an imprint of Penguin Random House
Comments
Post a Comment