শেখ হাসিনার পতন এবং প্রভাবশালী শ্রেণীর ভূমিকা
মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে রাজনীতির ‘Influential Pillar’ বা প্রভাবশালী স্তম্ভ সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। সামরিক কর্মকর্তা, বিদেশি মিত্র কিংবা ক্ষমতার দালালদের নিয়েই এই গোষ্ঠী গঠিত। এরা প্রত্যক্ষভাবে একজন নেতার গদি টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখে। ইতিহাস সাক্ষী, এই স্তম্ভ নড়বড়ে হলে পতন অনিবার্য। ঠিক যেমনটি আমরা শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে দেখলাম।
জুলাই-আগস্টের উত্তাল দিনগুলোর কথা স্মরণ করুন। ছাত্র-জনতার বাঁধভাঙা জোয়ারে ১৬ বছরের একচ্ছত্র শাসনের ভিত্তি কেঁপে উঠল। গণভবন অভিমুখে জনতার ঢল আর রাজপথ অবরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। পুলিশ যখন এই জনসমুদ্র সামাল দিতে ব্যর্থ, তখন সরকার শেষ ভরসা হিসেবে ‘লাস্ট লাইন অব ডিফেন্স’ বা সেনাবাহিনীকে মোতায়েন করল। কিন্তু নাটকীয়ভাবে সেনাবাহিনী নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করল। তারা জনতার দিকে বন্দুক তাক না করে বরং নীরব দর্শক হয়ে রইল। এর রাজনৈতিক বার্তা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট। বার্তাটি হলো, শেখ হাসিনা তাঁর ক্ষমতার সবচেয়ে শক্তিশালী স্তম্ভ বা ‘Influential Pillar’ হারিয়ে ফেলেছেন। একইসাথে সেনাবাহিনীর এই অবস্থান বুঝিয়ে দিল যে আন্তর্জাতিক পরাশক্তিরাও, বিশেষত আমেরিকা আর এই শাসকের পক্ষে নেই। এর অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দীর্ঘ ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের যবনিকা পতন ঘটল।
রাজনীতির একটি নিষ্ঠুর সত্য হলো, প্রভাবশালী শ্রেণিকে তুষ্ট রাখতে ব্যর্থ হলে ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখা অসম্ভব।
কৌশলগত কারণে এই শ্রেণিকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে হাতে রাখা হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বাংলাদেশের সেনাবাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping Mission) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি তাদের আয়ের এবং সম্মানের বড় উৎস। এই মিশনগুলোর প্রধান অর্থায়ন আসে আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব থেকে। তাই পশ্চিমারা অখুশি হলে বা নিষেধাজ্ঞা দিলে এই বিশাল সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে কেউ নিশ্চয়ই চাইবে না নিজের প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থ ক্ষুণ্ন হোক। ফলে ক্ষমতা দখলের আগে বা কোনো স্বৈরাচারকে বাঁচানোর আগে সেনাবাহিনী নিজের লাভ-ক্ষতি দশবার হিসেব করে।
হাসিনার বিদায়ঘণ্টা যখন বাজল, তখন দেওয়ালের লিখন ছিল স্পষ্ট। জনরোষের আড়ালে সেনাবাহিনী ‘সেফ এক্সিট’ বা নিরাপদ প্রস্থান নিশ্চিত করে তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করল। সাধারণ জনতা ভাবল, তাদের বিপ্লবই চূড়ান্ত বিজয় এনেছে। বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের শিরোনাম হলো: ‘জনরোষে হাসিনার পতন’। কিন্তু পর্দার আড়ালের চিত্রটি আরও গভীর।
এখন প্রশ্ন হলো, এরপর কী হবে? বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুততম সময়ে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দিকে এগোতে বাধ্য হচ্ছে। সমীকরণ বলছে, সেনাবাহিনীর পরোক্ষ তত্ত্বাবধানে হতে যাওয়া এই নির্বাচনে বিএনপির ক্ষমতায় আসার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এখানেও রয়েছে ভূ-রাজনীতির জটিল সমীকরণ। প্রতিবেশী ভারত কি বিএনপিকে বিশ্বাস করতে পারবে? সেই ‘Trust Issue’ বা আস্থাহীনতাই এখন রাজনীতির পরবর্তী দাবার চাল নির্ধারণ করবে।
Comments
Post a Comment