আমরা কি আসলেই আসল পৃথিবী দেখি? মস্তিষ্কের এক জাদুকরী কারুশিল্পের গল্প
আমি প্রায়ই রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে
ভাবি, আমি যা দেখছি তা কি আসলেই সত্যি? ওই যে দূরের নক্ষত্র, যার আলো হাজার বছর পথ
পাড়ি দিয়ে আমার চোখে এসে পৌঁছাল, তা কি কেবল পদার্থবিজ্ঞানের কিছু সূত্র? নাকি
আমার ভেতরে থাকা কোনো এক শিল্পী সেই আলোকে নিজের মতো করে নতুন রঙে সাজিয়ে নিচ্ছে?
রিচার্ড ডকিন্সের 'আনউইভিং দ্য রেইনবো' পড়তে পড়তে আমি এমন এক জগতের সন্ধান পেলাম,
যা আমাকে শিখিয়েছে যে আমরা কেউ আসলে 'আসল' পৃথিবীকে দেখি না। আমরা প্রত্যেকে
নিজেদের মাথার ভেতর এক অবিশ্বাস্য 'ভার্চুয়াল রিয়েলিটি' বা কাল্পনিক বাস্তবতা
নিয়ে ঘুরে বেড়াই। আজ আমি আপনাদের সেই গল্পের গভীরে নিয়ে যাব।
আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি যে
আমাদের পাঁচটি ইন্দ্রিয় আছে যা দিয়ে আমরা পৃথিবীকে অনুভব করি। কিন্তু ডকিন্স
বলছেন, এই ইন্দ্রিয়গুলো আসলে আমাদের কাছে পৃথিবীর পূর্ণাঙ্গ ছবি তুলে ধরে না।
আমাদের চোখ বা কান যা গ্রহণ করে, তা হলো কিছু বিশৃঙ্খল সংকেত মাত্র। আমাদের মস্তিষ্ক
হলো সেই জাদুকরী কারখানা, যেখানে এই বিচ্ছিন্ন সংকেতগুলোকে জোড়া দিয়ে একটি মসৃণ
এবং অর্থবহ জগত তৈরি করা হয়। একেই তিনি বলছেন 'রিউইভিং দ্য ওয়ার্ল্ড'।
ভাবুন তো, একটি
লাল গোলাপের কথা। বাইরে কিন্তু আসলে কোনো 'লাল' নেই। আছে শুধু নির্দিষ্ট তরঙ্গের
আলোর প্রতিফলন। সেই আলো যখন আমার চোখের রেটিনায় পড়ে, তখন আমার মস্তিষ্ক তাকে 'লাল'
নামে একটি লেবেল বা তকমা লাগিয়ে দেয়। অর্থাৎ, সৌন্দর্য বা রঙ বাইরে নেই, তা আমাদের
মস্তিষ্কের ভেতরে তৈরি হওয়া এক সুন্দর বিনুনি। ডকিন্স এখানে একটি চমৎকার কথা
বলেছেন আমরা আমাদের খুলির অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে থাকি, আর আমাদের মস্তিষ্ক সেখানে
আমাদের জন্য এক ত্রিমাত্রিক সিনেমা চালায়।
এটি আমাকে ভাবিয়েছে আমাদের কল্পনার ক্ষমতা নিয়ে। ডকিন্স বলছেন, আমরা যখন স্বপ্ন দেখি, তখন আসলে আমাদের মস্তিষ্কের এই 'রিয়েলিটি সিমুলেশন' সফটওয়্যারটি অফলাইনে চলে। অর্থাৎ বাইরের কোনো সংকেত ছাড়াই সে নিজের মতো করে একটি জগত তৈরি করে ফেলে। এই ক্ষমতাটিই মানুষকে অন্য সব প্রাণী থেকে আলাদা করেছে। আমরা শুধু বর্তমানকে দেখি না, আমরা অতীতকে বিশ্লেষণ করতে পারি এবং ভবিষ্যতের হাজারটা সম্ভাবনা নিয়ে মনে মনে ছক কাটতে পারি। এই 'মডেল মেকিং' বা নকশা তৈরির ক্ষমতাই আমাদের আধুনিক সভ্যতার ভিত্তি। বিজ্ঞান যখন ররামধনু বা রংধনুর রহস্য উন্মোচন করে (অর্থাৎ একে 'আনউইভ' করে), তখন সে আসলে মহাবিশ্বের প্রকৃত জটিলতাকে আরও নিখুঁতভাবে আমাদের সামনে মেলে ধরে। এতে বিস্ময় কমে না, বরং আমাদের ভেতরের জগতটা আরও সমৃদ্ধ হয়।
গল্পের পরবর্তী অংশ আরও রোমাঞ্চকর। ডকিন্স এখানে প্রশ্ন তুলেছেন, কেন মানুষের মস্তিষ্ক এত বড় হলো? কেন এটি হঠাৎ করে একটি বেলুনের মতো ফুলে উঠল? বিবর্তনের ইতিহাসে এমন দ্রুত পরিবর্তন খুব কমই দেখা যায়। মাত্র কয়েক লক্ষ বছরে আমাদের মস্তিষ্কের আকার তিন গুণ বেড়ে গেছে। কিন্তু এর পেছনে কারণটা কী?
এখানেই ডকিন্স 'সফটওয়্যার-হার্ডওয়্যার স্পাইরাল' নামে এক দারুণ তত্বের কথা বলেছেন। ধরুন, আপনি একটি কম্পিউটার কিনলেন। শুরুতে এর কাজ ছিল খুব সাধারণ। কিন্তু এরপর কেউ একজন সেই কম্পিউটারের জন্য একটি অসাধারণ 'সফটওয়্যার' তৈরি করল। সেই সফটওয়্যার চালানোর জন্য আপনার আরও শক্তিশালী 'হার্ডওয়্যার' বা যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হলো। হার্ডওয়্যার উন্নত হলে আবার আরও জটিল সফটওয়্যার তৈরি হলো। মানুষের ক্ষেত্রে এই সফটওয়্যারটি হলো, ভাষা এবং সংস্কৃতি।
আমাদের
পূর্বপুরুষরা যখন কথা বলতে শিখল, যখন তারা ইশারা বা শব্দের মাধ্যমে নিজেদের চিন্তা
অন্যকে জানাতে শিখল, তখন থেকেই একটি অদ্ভুত চক্র শুরু হলো। ভাষা ব্যবহার করার জন্য
মস্তিষ্কের সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। যাদের মস্তিষ্ক বড় ছিল, তারা ভালো ভাষা
ব্যবহার করতে পারত এবং সমাজে টিকে থাকার দৌড়ে এগিয়ে থাকত। এই প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে
আমাদের মস্তিষ্ক একটি বেলুনের মতো বড় হতে শুরু করল। এটি আর কেবল জৈবিক কোনো অঙ্গ
থাকল না, এটি হয়ে উঠল চিন্তা ও কল্পনার এক বিশাল আকাশ।
ডকিন্স এখানে 'মিম' (Meme) বা সাংস্কৃতিক এককের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। জিনের মতো মিমও এক মস্তিষ্ক থেকে অন্য মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে। একটি সুর, একটি নতুন রেসিপি, একটি বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, এসবই মিম। আমরা এখন আর কেবল জিনের গোলাম নই। আমরা এখন মিম বা আইডিয়ার জগতেও বাস করি। আমাদের এই 'বেলুন সদৃশ' মন এখন পৃথিবীকে ছাড়িয়ে নক্ষত্রমণ্ডলী নিয়ে চিন্তা করতে পারে, সময় নিয়ে গবেষণা করতে পারে। এটিই হলো বিজ্ঞানের চরম সার্থকতা।
শেষ কথা, অনেকে মনে করেন বিজ্ঞান সবকিছু ব্যাখ্যা করে দিলে পৃথিবীর রহস্য আর সৌন্দর্য হারিয়ে যায়। কিন্তু আমি যখন ডকিন্সের এই অধ্যায়গুলো পড়লাম, আমার কাছে মনে হলো বিজ্ঞান যেন আমার চোখে এক নতুন চশমা পরিয়ে দিল। আমি এখন জানি যে আমার চোখের সামনে যে পৃথিবী, তা আমার নিজের মস্তিষ্কের এক শৈল্পিক সৃষ্টি। আমি এখন বুঝি যে আমার এই মন কেন এত ব্যাকুল হয়ে অজানাকে জানতে চায়।
Comments
Post a Comment