বিনয় নাকি বিরক্তি? আমাদের সিদ্ধান্তহীনতা যখন অন্যের জন্য বোঝা
বন্ধুদের সাথে আড্ডায় বসেছেন অথবা পরিবারের সবাই মিলে বাইরে খেতে গিয়েছেন। মেনু কার্ড হাতে নিয়ে যখন কেউ জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, কী খাওয়া যায়?” তখন আমাদের মধ্যে অনেকেই খুব সাবলীলভাবে বলে ফেলি, “আমার জন্য যা খুশি একটা কিছু অর্ডার করলেই হবে, তোরা যা খাবি তাই।”
আমরা মনে করি এই
কথাটি বলে আমরা অনেক বড় বিনয় দেখালাম। নিজেকে খুব ‘ফ্লেক্সিবল’ বা নমনীয় হিসেবে
উপস্থাপন করলাম। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপাতদৃষ্টিতে এই বিনয়ী আচরণটি আসলে আপনার
পাশের মানুষটির মস্তিষ্কের ওপর কী পরিমাণ চাপ তৈরি করছে?
যখন আপনি বলেন
“আমার যা খুশি দিলেই হবে,” তখন আপনি আসলে নিজের সিদ্ধান্তের দায়িত্বটুকু অন্যের
ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। কম্পিউটার বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে, আপনি আপনার নিজের
‘কগনিটিভ লোড’ বা মস্তিষ্কের চিন্তার চাপটি অন্যকে দিয়ে দিলেন।
এখন আপনার বন্ধুকে
বা সামনের মানুষটিকে আপনার হয়ে কয়েকটি জটিল কাজ করতে হচ্ছে:
১. তাকে আপনার
পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।
২. আপনার কোনো
কিছুতে অ্যালার্জি আছে কি না বা আপনার ডায়েট কেমন তা মনে করার চেষ্টা করতে হচ্ছে।
৩. পুরো মেনু কার্ড
ঘেঁটে এমন কিছু বের করতে হচ্ছে যা আপনার এবং তার, উভয়ের জন্যই মানানসই।
এই পুরো
প্রক্রিয়াটি মস্তিষ্কের জন্য বেশ ক্লান্তিকর। আপনি বিনয় দেখাতে গিয়ে উল্টো সামনের
মানুষটিকে একটি কঠিন সমস্যার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন।
কেন এটি বিনয় নয়?
আমরা যখন নির্দিষ্ট
কোনো পছন্দের কথা বলি না, তখন আমরা আসলে অন্যকে একটি ‘আনডিফাইন্ড’ বা অসংজ্ঞায়িত
সমস্যার সমাধান করতে বাধ্য করি। প্রকৃত ভদ্রতা হলো অন্যের কাজ সহজ করে দেওয়া। যখন
আপনি সরাসরি বলেন, “আমি পিৎজা খেতে চাই” অথবা “আমার ঝাল খাবার খেতে ইচ্ছে করছে
না,” তখন আপনি সামনের মানুষটির পছন্দের পরিধি ছোট করে আনছেন। এতে তার পক্ষে
সিদ্ধান্ত নেওয়া অনেক সহজ হয়ে যায়।
অন্যের মন বুঝতে
চাওয়ার এই চেষ্টাকে বলা হয় ‘সিমুলেশন’। আর মানুষের মস্তিষ্কের জন্য সবচেয়ে কঠিন
কাজগুলোর একটি হলো অন্য কেউ কী ভাবছে বা কী চাচ্ছে তা অনুমান করা। আপনি যখন কোনো
ইঙ্গিত দেন না, তখন আপনি আসলে অন্যদের সেই ক্লান্তিকর সিমুলেশনটি করতে বাধ্য
করছেন।
কম্পিউটেশনাল কাইন্ডনেস কী?
প্রকৃত দয়া বা
Kindness হলো সেটিই, যা অন্যের মানসিক চাপ কমায়। যদি আপনাকে কেউ জিজ্ঞেস করে,
“আমরা কখন দেখা করতে পারি?” এবং আপনি বলেন “যেকোনো সময়,” তবে আপনি আসলে তাকে একটি
বিশাল ক্যালেন্ডার থেকে সময় খুঁজে বের করার দায়িত্ব দিলেন। এর চেয়ে যদি বলেন, “আমি
কাল দুপুর ২টা থেকে ৪টার মধ্যে ফ্রি আছি,” তবে এটিই হলো প্রকৃত ভদ্রতা বা
কম্পিউটেশনাল কাইন্ডনেস।
শেষ কথা, আমাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট সামাজিক মিথস্ক্রিয়াগুলো আসলে এক একটি অ্যালগরিদম। আমরা যদি একটু সচেতন হই, তবে এই অহেতুক মানসিক চাপগুলো এড়িয়ে চলা সম্ভব। তাই পরের বার যখন বন্ধুরা জানতে চাইবে কী খাবেন, তখন কেবল ‘বিনয়’ না দেখিয়ে নিজের পছন্দের কথাটি স্পষ্ট করে বলুন। এতে আড্ডাটা যেমন সহজ হবে, তেমনি অন্যদের মস্তিষ্কের ওপর থেকে একটি অদৃশ্য বোঝা নেমে যাবে।
মনে রাখবেন, স্পষ্ট
কথা বলা কেবল ব্যক্তিত্বের লক্ষণ নয়, এটি অন্যের প্রতি আপনার এক ধরনের সম্মান এবং
দয়াও বটে।
References:
1. Kahneman , D. (2011). Thinking , Fast and Slow . Farrar, Straus and Giroux. (Reference for cognitive effort and decision-making processes).
2. Suchman, L . A. (1987) . Plans and Situated Actions: The Problem of Human-Machine Communication. Cambridge University Press.
3. Sweller , J. (1988). Cognitive Load During Problem Solving: Effects on Learning. Cognitive Science
4. Christian, B., and Griffiths, T. (2016). Algorithms to Live By: The Computer Science of Human Decisions. Henry Holt and Company.
Comments
Post a Comment