স্বাধীন ইচ্ছা কি কেবলই একটি মরীচিকা?
আজকের দিনটি, ১৫/০৩/২০২৬
আমরা সাধারণত মনে করি যে আমরা আমাদের
প্রতিটি কাজের পেছনে থাকা স্বাধীন ইচ্ছার মালিক। সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে
কী পোশাক পরব কিংবা জীবনের বড় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া, সবকিছুর পেছনে আমাদের নিজস্ব
একটা নিয়ন্ত্রণ কাজ করে বলে আমাদের বিশ্বাস। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে যে এই
স্বাধীন ইচ্ছার ধারণাটা আসলে পুরোপুরি একটা বিভ্রম।
আমাদের জীবনটাকে যদি সমুদ্রের বুকে
ভাসমান একটি বিশাল জাহাজের সাথে তুলনা করি, তবে বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে। আপনি হয়তো
জাহাজের স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে ধরে আছেন এবং ভাবছেন যে আপনিই জাহাজটিকে ডানে
বা বামে ঘুরাচ্ছেন। কিন্তু এই বিশাল সমুদ্র, বাতাসের গতিপথ কিংবা যে জাহাজে আপনি
দাঁড়িয়ে আছেন, এর কোনটিই আপনার তৈরি করা নয়। সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক সত্য হলো, আপনি
যে মুহূর্তে হালটি ঘোরানোর সিদ্ধান্ত নিলেন, সেই সিদ্ধান্তটিও আপনার মস্তিষ্কে আগে
থেকে ঘটে যাওয়া একটি প্রক্রিয়ার ফল।
বিজ্ঞানীদের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা
গেছে যে কোনো একটি কাজ করার কয়েক সেকেন্ড আগেই আমাদের মস্তিষ্কের মোটর কর্টেক্স
সেই কাজের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলে। অর্থাৎ আমরা সচেতনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত
নেওয়ার অনেক আগেই আমাদের মস্তিষ্ক সেই সিদ্ধান্তটি নিয়ে রাখে। আমরা আসলে আমাদের মস্তিষ্কে
ঘটে যাওয়া সিদ্ধান্তের একজন নীরব সাক্ষী মাত্র। আমরা পরবর্তী মুহূর্তে কী ভাবতে
যাচ্ছি, তা আমরা নিজেরাও জানি না যতক্ষণ না চিন্তাটা আমাদের মাথায় আসে।
আজকের
দিনটি, ১৬/০৩/২০২৬
এখন
প্রশ্ন আসতে পারে যে যদি আমাদের কোনো স্বাধীন ইচ্ছাই না থাকে তবে আমাদের পরিশ্রম
বা চেষ্টার কি কোনো মূল্য নেই? স্যাম হ্যারিস বিষয়টি খুব চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা
করেছেন। ধরুন একজন মানুষ তার ওজন কমানোর জন্য অনেক পরিশ্রম করল। তার এই পরিশ্রম বা
ডিসিপ্লিনকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু প্রশ্ন হলো যে দিনটিতে তার মনে হঠাৎ এই
প্রবল ইচ্ছাশক্তি তৈরি হলো সেই শক্তিটি কি সে নিজে সজ্ঞানে তৈরি করেছে? বিজ্ঞান
বলছে এই ইচ্ছাশক্তি আসলে একটি জৈবিক ঘটনা। আমাদের জিন আমাদের পরিবেশ এবং অতীতের সব
অভিজ্ঞতার একটি জটিল মিশ্রণই নির্ধারণ করে দেয় যে আমাদের মনে কখন কী ইচ্ছা জাগবে।
আমরা আমাদের ইচ্ছেমতো কাজ করতে পারি ঠিকই কিন্তু আমাদের কী ইচ্ছে করবে তা আমরা আগে
থেকে ঠিক করতে পারি না।
অনেকে
মনে করেন যে আমাদের হাতে যেহেতু নিয়ন্ত্রণ নেই তবে কি আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকব?
একে বলা হয় নিয়তিবাদ। কিন্তু বিজ্ঞান যা বলে তা হলো কার্যকারণবাদ। এর মানে হলো
প্রতিটি ঘটনার পেছনে একটি নির্দিষ্ট কারণ আছে। আপনি যদি সারাদিন বিছানায় শুয়ে
থাকেন তবে আপনার জীবনের উন্নতি হবে না। কারণ সেই শুয়ে থাকাটাই একটি কারণ হিসেবে
আপনার ভবিষ্যৎ ফলাফলকে খারাপের দিকে নিয়ে যাবে। অর্থাৎ আমাদের প্রতিটি কাজই
গুরুত্বপূর্ণ কারণ সেগুলো আমাদের আগামীকালকে প্রভাবিত করে।
এই
সত্যটি জানলে আমাদের মধ্যে অহংকার কমে যায় এবং সহানুভূতি অনেক বেড়ে যায়। যখন আমরা
বুঝতে পারি যে আমাদের মেধা বা সাফল্য আসলে আমাদের লটারিতে জেতা জিনের অবদান তখন
আমাদের গর্ব করার কিছু থাকে না। একইভাবে যখন অন্য কেউ খারাপ আচরণ করে তখন তাকে
ঘৃণা করার বদলে আমরা বুঝতে পারি যে সে হয়তো তার পরিস্থিতির শিকার। বইটিতে একে
বায়োকেমিক্যাল পাপেট বা জৈব রাসায়নিক পুতুল বলা হয়েছে। যখন আমরা বুঝতে পারি যে
মানুষ তার নিউরন বা রাসায়নিক পরিবর্তনের কারণেই এমন আচরণ করছে তখন তাদের প্রতি
আমাদের রাগ কমে যায় এবং ক্ষমা করার মানসিকতা তৈরি হয়।
সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি আসে যখন আমরা অপরাধীদের কথা ভাবি। যদি আমাদের কোনো স্বাধীন ইচ্ছা না থাকে তবে একজন খুনি বা অপরাধীকে আমরা কেন দোষী বলব? স্যাম হ্যারিস এখানে সহিংসতার পাঁচটি স্তরের কথা বলেছেন। যেমন, একটি চার বছরের শিশু যখন ভুল করে গুলি চালায়, আমরা তাকে খুনি বলি না কারণ তার মস্তিষ্ক তখনো অবুঝ। কিন্তু যখন কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি খুনের মতো কাজ করে, তখন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যায়।
মজার
বিষয় হলো, যদি দেখা যায় সেই প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির মস্তিষ্কে একটি বড় টিউমার আছে
যা তার আবেগ ও নৈতিকতা নিয়ন্ত্রণকারী অংশকে নষ্ট করে দিয়েছে, তখন কিন্তু আমাদের
ঘৃণা সহানুভুতিতে রূপ নেয়। তখন আমরা তাকে খুনি হিসেবে না দেখে জীববিজ্ঞানের একজন
হতভাগ্য শিকার হিসেবে দেখি। হ্যারিসের মতে, একজন ভয়ংকর সাইকোপ্যাথ এবং একজন টিউমার
আক্রান্ত রোগীর মধ্যে তফাত শুধু এইটুকুই যে আমরা টিউমারটা স্ক্যান রিপোর্টে দেখতে
পাই, কিন্তু সাইকোপ্যাথের মস্তিষ্কের ত্রুটিগুলো এখনো সাধারণ স্ক্যানে ধরা পড়ে না।
এই
দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের বিচার ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয় না বরং একে আরও বেশি
বিজ্ঞানভিত্তিক এবং মানবিক করে তোলে। আমরা সমাজকে নিরাপদ রাখতে একজন ভয়ংকর
অপরাধীকে অবশ্যই বন্দি করব। তবে সেটা তাকে নৈতিকভাবে শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়, বরং
সাধারণ মানুষকে নিরাপদ রাখার জন্য। ঠিক যেমন একটি বাঘ লোকালয়ে চলে এলে আমরা তাকে
খাঁচায় বন্দি করি। আমরা বাঘটিকে "পাপী" বলে ঘৃণা করি না বরং মানুষের
প্রাণ বাঁচাতে তাকে আলাদা করে রাখি।
ভবিষ্যতে
যদি অপরাধ প্রবণতা দূর করার কোনো ঔষধ আবিষ্কৃত হয়, তবে অপরাধীকে কষ্ট দেওয়ার চেয়ে
তাকে চিকিৎসা দেওয়াই হবে সবচেয়ে লজিক্যাল সমাধান। আমাদের পুরো লক্ষ্য তখন প্রতিশোধ
থেকে সরে এসে সংশোধন বা রিহ্যাবিলিটেশনের দিকে যাবে। এই সত্যটি মেনে নিলে আমাদের
মানবিকতা কমে যায় না বরং এটি আমাদের একে অপরের প্রতি আরও বেশি সহানুভূতিশীল করে
তোলে। আমরা বুঝতে পারি যে জীবনের প্রতিটি স্তরে ভাগ্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। সফল
মানুষের যেমন অযৌক্তিক অহংকার করার কিছু নেই, তেমনি সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধীটিও আসলে
একটি দুর্ভাগ্যজনক সমীকরণের চূড়ান্ত শিকার। এটি আমাদের পৃথিবীকে এক সম্পূর্ণ নতুন
এবং পরিষ্কার আলোয় দেখতে সাহায্য করে।
শেষ কথা, আমার এই যাত্রা এখানেই সমাপ্ত নয়।
Primary Source:
Book Title: Free WillAuthor: Sam Harris
Publisher: Free Press (A Division of Simon & Schuster, Inc.)
Publication Year: 2012
Section-wise References (Mapping to your text):
The Illusion & Neuroscience (Part 1):
Pages 1–13: Discusses the unconscious origins of will. It covers how brain activity in the motor cortex precedes conscious intent (based on experiments by Benjamin Libet and others).
Determinism vs. Fatalism & Biological Events (Part 2):
Pages 34–35: Clarifies the distinction between fatalism and determinism (causality). It explains that while we don't have free will, our choices and efforts still matter because they are part of the causal chain.Page 45: Discusses how the realization of having no free will can reduce pride and increase compassion, referring to humans as "biochemical puppets."
Moral Responsibility & Justice System (Part 3):
Pages 48–51: Details the "Five levels of violence" and the specific case of a brain tumor (e.g., the Charles Whitman case or similar neurological examples) that affects moral agency.
Pages 52–54: Explains the logic of the "Tiger in a cage" analogy. It argues that we can restrain dangerous people for social safety without needing to believe they possess a "soul" or free will, moving the focus from retribution to rehabilitation.
Comments
Post a Comment