অস্তিত্বের সংকট ও আমাদের দৈনন্দিন উদ্বেগ

অস্তিত্বের সংকট ও আমাদের দৈনন্দিন উদ্বেগ (পর্ব ১)

আমাদের প্রতিদিনের জীবনে যে প্রবল একটা উদ্বেগ বা চাপা অস্বস্তি কাজ করে, তার দিকে গভীরভাবে তাকালে অদ্ভুত কিছু বিষয় চোখে পড়ে। সাধারণত আমরা ধরে নিই এই অস্বস্তির কারণ হয়তো কাজের প্রচন্ড চাপ, ট্রাফিক জ্যাম, অথবা আগামীকালের কোন ডেডলাইন। আমরা আমাদের মানসিক অবস্থাটাকে একটা রুটিন চেকআপের মত করে দেখি। আমাদের মনে হয়, কারণটা একবার খুঁজে পেলেই খুব সহজে সমাধান বের করে ফেলা যাবে।

সহজ সমাধান খোঁজার এই প্রবণতা খুবই স্বাভাবিক। আমরা সবকিছুকে একটা নির্দিষ্ট ছকে ফেলে বিচার করতে পছন্দ করি। একটা লজিক্যাল ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে পারলে মনে এক ধরনের সান্ত্বনা আসে। আমরা ভাবতে ভালোবাসি যে সমস্যাটা বাইরের কোন পরিস্থিতি থেকে তৈরি হয়েছে এবং পরিস্থিতি বদলালে আমরা রাতারাতি ভালো হয়ে যাব। কিন্তু যখন আমরা মানুষের অবচেতন মন আর অস্তিত্বের সংকটের বিশাল জগতে প্রবেশ করি, তখন সান্ত্বনার এই ছকটা পুরোপুরি ভেঙে যায়।

আর্নেস্ট বেকারের সাড়া জাগানো বই 'দ্য ডিনায়েল অফ ডেথ' এর পঞ্চম থেকে অষ্টম অধ্যায় এবং বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক গবেষণাপত্র ঘাটলে দেখা যায়, আমাদের অনেক মানসিক বা সামাজিক সমস্যা আসলে সাধারণ কোন ব্যাপার নয়। এগুলো আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার এক গভীরতর সংকট থেকে জন্ম নেয়। মানুষের সবচেয়ে আদিম যে ভয়, অর্থাৎ মৃত্যুর ভয়, তা কিভাবে সম্পূর্ণ অজান্তেই আমাদের প্রতিদিনের কাজ, সম্পর্ক এবং পুরো মানসিক অবস্থাকে পেছন থেকে পুতুলের মত নিয়ন্ত্রণ করছে, সেটাই এখানে মূল ভাবনার বিষয়।

এই পুরো মেকানিজম বুঝতে হলে আমাদের প্রথমে ড্যানিশ দার্শনিক সোরেন কিয়েরকেগার্ডের কাছে যেতে হবে। মজার ব্যাপার হলো, তিনি কোন মনোবিজ্ঞানী ছিলেন না। অথচ আধুনিক বিজ্ঞানীদের চেয়ে তিনি মানুষের মনকে অনেক বেশি নিখুঁতভাবে বুঝতে পেরেছিলেন। তার মূল আলোচনার জায়গাটাই ছিল 'ড্রেড' বা অ্যাংজাইটি। তিনি এই উদ্বেগকে একটি অসাধারণ নাম দিয়েছিলেন, 'ডেজিনেস অফ ফ্রিডম' বা স্বাধীনতার মাথা ঘোরা।

এই স্বাধীনতার মাথা ঘোরা কনসেপ্টটা অসম্ভব শক্তিশালী। একটা দৃশ্যপট কল্পনা করা যাক। কেউ একজন একটা বহুতল ভবনের একেবারে ছাদে রেলিংয়ের ধারে দাঁড়িয়ে নিচে তাকাচ্ছে। তার ভেতরে প্রচন্ড একটা ভয় কাজ করছে। আমরা সাধারণত ভাবি ভয়টা বোধহয় পা পিছলে নিচে পড়ে যাওয়ার বা মাধ্যাকর্ষণের ভয়। কিন্তু কিয়েরকেগার্ডের দর্শন বলছে আসল ভয়টা পড়ে যাওয়ার নয়। আসল ভয়টা হলো হঠাৎ করে এই বিষয়টা উপলব্ধি করা যে চাইলে ওই মুহূর্তে নিচে লাফ দেওয়ার স্বাধীনতাটুকু ওই মানুষটার নিজের হাতেই আছে। এই যে অসীম একটা স্বাধীনতা, এইটাই হলো সবচেয়ে ভয়ঙ্কর।

এই অ্যানালজিটা মানুষের অস্তিত্বের মূল দ্বন্দ্বটাকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলে। একদিকে আমাদের চিন্তার রয়েছে অসীম স্বাধীনতা। আমরা চাইলে যেকোনো কিছু কল্পনা করতে পারি, মহাবিশ্বের যেকোনো প্রান্তে নিজেদের নিয়ে যেতে পারি। কিন্তু অন্যদিকে আমাদের শরীরটা ভীষণ সীমাবদ্ধ। এই শরীরটা রক্তমাংসের, যা অসুস্থ হয়, বৃদ্ধ হয় এবং একসময় নিশ্চিতভাবে ধ্বংস হয়ে যায়।

মানুষের মস্তিষ্ক বা স্নায়ুকোষ (Synapse) সারাজীবন এই অসীম আত্মা (Soul) বনাম সসীম শরীরের বিপরীতমুখী সত্যের মাঝে একটা সামঞ্জস্য খোঁজার চেষ্টা করে। এই চরম স্বাধীনতার ভার বা মৃত্যু ভয় সামলাতে না পেরে মানুষ যা করে, সেটাকে কিয়েরকেগার্ড বলেছেন 'শাটআপনেস' বা গুটিয়ে থাকা। আমরা প্রতিদিনের ব্যস্ততার যে রুটিন তৈরি করি বা ঘন্টার পর ঘন্টা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোল করতে থাকি, এগুলো আসলে এক ধরনের ইমোশনাল বাংকার।

আমরা ইচ্ছাকৃতভাবে নিজেদের এই বাংকারের ভেতরে আটকে রাখি, যাতে ওই স্বাধীনতার ভার বা একদিন আমরা মরে যাব, এই চরম সত্যটা নিয়ে আমাদের এক মুহূর্তও ভাবতে না হয়। আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদের আসল সত্তা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। আর পালানোর এই দৌড়টাই দিনশেষে আমাদের ক্লান্ত করে দিচ্ছে।



অস্তিত্বের সংকট ও আমাদের দৈনন্দিন উদ্বেগ (পর্ব ২)

আমরা ভাবতে পারি, দার্শনিকরা হয়তো এসব নিয়ে অনেক ভেবেছেন। কিন্তু যারা সরাসরি মানুষের মন নিয়ে কাজ করেছেন, সেই আধুনিক মনোবিজ্ঞানীদের নিশ্চয়ই মৃত্যু ভয় ছিল না। কিন্তু ইতিহাস আমাদের অন্য কথা বলে। ইতিহাসের পাতা উল্টালে এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়। স্বয়ং সিগমুন্ড ফ্রয়েড, যিনি মানুষের মন সম্পর্কে সবকিছু ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন, তিনিও মৃত্যুকে প্রচন্ড ভয় পেতেন।

ফ্রয়েডের এই নিজস্ব সংগ্রামটা মনস্তত্ত্বের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আইরনিগুলোর একটি। তার মৃত্যু ভয় বা ডেথ ফোবিয়া এতটাই তীব্র মাত্রার ছিল যে, প্রকাশ্যে এ বিষয়টি নিয়ে কথা বলা তো দূরের কথা, এটা নিয়ে কেউ আলোচনা করলেও তিনি রীতিমতো অস্বস্তি বোধ করতেন। অথচ এই মানুষটি অবচেতন মনের সমস্ত অন্ধকার দিক নিয়ে বছরের পর বছর কাজ করেছেন।

আর্নেস্ট বেকারের বইয়ের বিশ্লেষণ থেকে আমরা একটা অবিশ্বাস্য ঘটনার কথা জানতে পারি। ফ্রয়েডের একজন তরুণ এবং অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন কার্ল জুং। ঘটনা হলো, এই কার্ল জুং এর আশেপাশে থাকলে ফ্রয়েড মাঝে মাঝে আক্ষরিক অর্থেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন বা ফেইন্ট করতেন। প্রথমে শুনলে মনে হয়, এটা হয়তো কোন শারীরিক অসুস্থতা। কিন্তু বিশ্লেষণ বলছে অন্য কথা। জুং ছিলেন ফ্রয়েডের কাছে ভবিষ্যতের প্রতীক। এমন একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, যে সময়ে স্বয়ং ফ্রয়েড আর এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবেন না। জুং এর তারুণ্য এবং মেধা ফ্রয়েডকে প্রতিনিয়ত তার নিজের মরণশীলতার কথা মনে করিয়ে দিত।

এখন প্রশ্ন হলো, একজন জিনিয়াস বা মনস্তত্ত্বের জনক কেন এমন আচরণ করবেন? কারণ ফ্রয়েড অবচেতনভাবে তার নিজের বিজ্ঞানকে, মানে তার এই সাইকোঅ্যানালাইসিসের তত্ত্বকে একটি 'হিরো প্রজেক্ট' হিসেবে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন। হিরো প্রজেক্ট হলো মানুষের এমন একটা প্রচেষ্টা যার মাধ্যমে সে বিশ্বাস করতে চায় যে সে নিছক একটা প্রাণী নয়, বরং তার জীবনটার একটা মহাজাগতিক অর্থ আছে।

ফ্রয়েড চেয়েছিলেন নিজের কাজের মধ্য দিয়ে এক ধরনের অমরত্ব লাভ করতে। আমরা যদি একে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখি, দুনিয়ার বড় বড় বিজ্ঞানী, শিল্পপতি বা নেতারা যখন নিজেদের কাজের মাধ্যমে অমর হতে চান বা ইতিহাস গড়তে চান, সেটা সবসময় তাদের মহানুভবতা নয়। বরং স্রেফ জীববৈজ্ঞানিক প্রাণী হিসেবে একদিন মরে যাব, এই রূঢ় বাস্তবতাকে অস্বীকার করার একটা চমৎকার ঢাল।

দিনশেষে আমরা সবাই স্রেফ একটা জীববৈজ্ঞানিক প্রাণী। এই সত্যটা মেনে নেওয়া বোধহয় সবচেয়ে মেধাবী মস্তিষ্কগুলোর জন্য খুব কঠিন। তারা হয়তো ভাবে, এত বই লিখেছি বা এত বড় সাম্রাজ্য গড়েছি, আমি কিভাবে স্রেফ মাটিতে মিশে যেতে পারি? এই উপলব্ধিটাই ফ্রয়েডকে ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। বড় বড় ডিগ্রী বা জ্ঞানের পাহাড় জমালেও আমরা দিনশেষে শারীরবৃত্তীয় প্রাণীই থেকে যাই। আর যখনই আমরা এটা ভুলে যেতে চাই, তখনই আমরা আমাদের কাজ বা বুদ্ধিবৃত্তিক অর্জনগুলোকে একটা বর্ম হিসেবে ব্যবহার করি। ফ্রয়েড চেয়েছিলেন তার বিজ্ঞান তাকে মৃত্যুর ভয় থেকে বাঁচাবে। কিন্তু জুং যখন সেই বিজ্ঞানের উত্তরাধিকারী হতে আসলেন, ফ্রয়েডের সেই বর্মটা ভেঙ্গে পড়লো।

এখানে একটা বড় প্রশ্ন মাথায় আসে। সবার তো আর ফ্রয়েডের মতো যুগান্তকারী কিছু আবিষ্কার করার ক্ষমতা নেই। আমার বা আপনার মত সাধারণ মানুষ, যাদের নিজস্ব কোন বিশাল হিরো প্রজেক্ট থাকে না, তারা কি করে? আর ঠিক এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই আমরা মানুষের আচরণের সবচেয়ে অন্ধকার এবং জটিল দিকগুলোর একটির মুখোমুখি হই। যখন মানুষের নিজের কোন হিরো প্রজেক্ট থাকে না, তখন সে সুরক্ষার জন্য অন্য মানুষের দিকে ছুটে যায়। মনস্তত্ত্বের ভাষায় এই প্রক্রিয়ার নাম হল 'ট্রান্সফারেন্স'।

ট্রান্সফারেন্স কিভাবে কাজ করে তার মেকানিজমটা বোঝা খুব জরুরি। ধরুন প্রথম ধাপে একজন মানুষ নিজের অস্তিত্বহীনতা বা মৃত্যুর ভয় নিয়ে ভীষণ আতঙ্কে আছে। এই বিশাল মহাবিশ্বে নিজেকে তার খুব ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে। দ্বিতীয় ধাপে সে এমন একজন মানুষকে খুঁজে বের করে, হতে পারে সেটা একজন ক্যারিসমেটিক নেতা, ধর্মীয় গুরু বা একজন রোমান্টিক সঙ্গী, যাকে দেখে তার মনে হয় এই মানুষটা অসীম ক্ষমতার অধিকারী বা খুব আত্মবিশ্বাসী। আর তৃতীয় ধাপে ওই সাধারণ মানুষটি মহাবিশ্বের সমস্ত ক্ষমতা, অর্থ আর ম্যাজিক ওই নেতার বা সঙ্গীর উপর চাপিয়ে দেয়। তাকে রীতিমত দেবতা বানিয়ে ফেলে।

ব্যাপারটা অনেকটা অন্য কোন মানুষকে নিজের 'হিউম্যান শিল্ড' বা মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার মতো। অবচেতনভাবে ওই মানুষটা ভাবে, আমি যদি এই ক্ষমতাধর মানুষটার ছায়ায় থাকি, তার দলের অংশ হই বা তার প্রেমে ডুবে থাকি, তাহলে মৃত্যু বা শূন্যতা আমাকে আর ছুঁতে পারবে না। আমরা যেন অন্য কাউকে ঈশ্বর বানিয়ে আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। এই তীব্র আকাঙ্ক্ষা থেকেই জন্ম নেয় 'নেক্সাস অফ আনফ্রিডম' বা পরাধীনতার এক জটিল জাল। মানুষ শুধু একটু নিরাপদ বোধ করার জন্য স্বেচ্ছায় অন্যের গোলামী মেনে নেয়, কারণ নিজের জীবনের দায়িত্ব নেওয়ার অর্থই হল নিজের মৃত্যুর দায়িত্ব নেওয়া।

এই মেকানিজমটাই আমাদের চারপাশের অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়। কেন মানুষ বছরের পর বছর ক্ষতিকর বা টক্সিক সম্পর্কে আটকে থাকে? কিংবা কেন সমাজে বিপদজনক রাজনৈতিক মতাদর্শের এত অন্ধ অনুসারী তৈরি হয়? তারা আসলে ওই মতাদর্শ বা মানুষটাকে ভালোবাসে না, তারা শুধু নিজেদের মৃত্যু ভয় আর শূন্যতাকে ঢাকতে চায়। ওই টক্সিক মানুষটা বা স্বৈরাচারী নেতাটা তাদের কাছে একটা 'সিস্টেম অফ মিনিং' বা অর্থপূর্ণতার জোগান দেয়।

অস্তিত্বের সংকট ও আমাদের দৈনন্দিন উদ্বেগ (পর্ব ৩)

সমাজ আর রাষ্ট্রব্যবস্থার ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে এই মোহ বা ট্রান্সফারেন্স দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়, সেটা ভাবলে সত্যিই শিউরে উঠতে হয়। যখন লাখ লাখ মানুষ তাদের নিজেদের ভেতরের শক্তি আর ক্ষমতাকে কোন একক নেতার হাতে তুলে দেয়, তখন সেই নেতা হয়ে ওঠেন সর্বশক্তিমান আর সাধারণ মানুষ হয়ে যায় সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। এটা আসলে একটা কালেক্টিভ ইল্যুশন। মানুষ ভাবে তারা একটা মহান লক্ষ্যের পেছনে ছুটছে, কিন্তু আদতে তারা শুধু নিজেদের ভয় থেকে পালাচ্ছে।

তাহলে তো পুরো ব্যাপারটা একটা বিশাল গোলক ধাঁধার মতো হয়ে গেল। আমরা দেখলাম নিজের কাজের আড়ালে বা হিরো প্রজেক্টের আড়ালে পালানোটা কাজ করে না। ফ্রয়েডের ক্ষেত্রে সেটা কাজ করেনি। আবার অন্য কাউকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা বা মানব ঢাল বানানোটাও চরম মাত্রায় ক্ষতিকর। কারণ সেটা এক ধরনের পরাধীনতার জন্ম দেয় এবং মানুষ তার নিজের সত্তাই হারিয়ে ফেলে। তবে কি ভয়ঙ্কর মানসিক শূন্যতা থেকে বাঁচার কোন আসল উপায় নেই?

এই হতাশার জায়গাটাতেই আশার আলো নিয়ে আসেন অটো র‍্যাংক এবং তার সৃজনশীল সমাধানের তত্ত্ব। অটো র‍্যাংক ছিলেন ফ্রয়েডের ছাত্র। কিন্তু একটা পর্যায়ে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে মানুষের মনকে শুধুমাত্র জীববিজ্ঞান আর প্রবৃত্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তিনি তার গুরুর ওই কঠোর জীববিজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নিজেকে সরিয়ে আনেন। র‍্যাংক বিশ্বাস করতেন মানুষের ভেতরে পশুর মত শুধু বেঁচে থাকার প্রবৃত্তি নেই, বরং একটি প্রবল সৃষ্টি করার আকাঙ্ক্ষা বা নিড টু ক্রিয়েট রয়েছে।

অটো র‍্যাংকের মতে সমাজের মানুষ মূলত দুটো ভাগে বিভক্ত। একদিকে আছে তারা যারা নিজেদের চরিত্রের বর্ম বা ক্যারেক্টার আর্মারের ভেতরে আটকে পড়ে। এদেরকে তিনি বলেছেন নিউরোটিক বা স্নায়ুবিক মানুষ। এরা আসলে পাগল নয়, এরা ভয়ঙ্কর রকমের ভীতু। এরা জীবন এবং মৃত্যু দুটোকেই এত বেশি ভয় পায় যে এরা এক ধরনের অবশ বা প্যারালাইজড জীবন যাপন করে। এরা জীবনের ঝুঁকি নিতে ভয় পায়, আবার মৃত্যুকেও মেনে নিতে পারে না।

আর এর ঠিক বিপরীত মেরুতেই রয়েছে ক্রিয়েটিভ বা সৃজনশীল মানুষ। র‍্যাংক বলছেন না যে সৃজনশীল মানুষরা ভয়ের ঊর্ধ্বে। তাদেরও ভয় আছে। কিন্তু পার্থক্য হলো তারা সেই ভয়ের কারণে অবশ হয়ে যায় না। তারা সেই একই ভয় এবং ভেতরের অস্থিরতাকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে নতুন কিছু নির্মাণ করে। শিল্প, সাহিত্য বা দর্শন শুধু সময় কাটানোর শখ নয়, র‍্যাংকের মতে এগুলো হলো মৃত্যুর বিরুদ্ধে লড়াই করার এক শৈল্পিক হাতিয়ার। মানব জীবনের এই সংকটের একমাত্র প্রকৃত নিরাময় হলো ক্রিয়েটর অফ মিনিং বা অর্থের স্রষ্টা হওয়া।

এখানে একটা বড় ধরনের খটকা লাগতে পারে। এই যে র‍্যাংক বলছেন সৃজনশীল হওয়াটাই সমাধান, এটা কি আসলেও কোন চূড়ান্ত নিরাময়? এটা কি স্রেফ ফ্রয়েডের হিরো প্রজেক্টেরই আরেকটা সুন্দর রোমান্টিক নাম নয়?

আপাতদৃষ্টিতে দুটোকে একই রকম মনে হতে পারে। কিন্তু কিয়েরকেগার্ডের ধারণার সাথে র‍্যাংকের ধারণার মেলবন্ধন করলে বিষয়টা পরিষ্কার হয়। পার্থক্যটা আসলে উদ্দেশ্য আর উপলব্ধির জায়গায়। হিরো প্রজেক্টের মূল সমস্যা ছিল সেটা মৃত্যুকে অস্বীকার করতে চায়। হিরো প্রজেক্ট হলো এক ধরনের ডিনায়েল। কিন্তু র‍্যাংকের সৃজনশীলতার ধারণাটি মৃত্যুকে অস্বীকার করে না। এটি হলো প্যারালাইজড না হয়ে ভয়ের সাথে সহাবস্থান করে একটি অর্থবহ জীবন যাপনের উপায়। তার মানে সৃজনশীল মানুষ জানে যে সে একদিন মারা যাবে, কিন্তু তবুও সে সৃষ্টি চালিয়ে যায়।

সৈকতে বসে বালি দিয়ে একটা চমৎকার দুর্গ বানানোর মতো বিষয়টা। যে দুর্গটা বানাচ্ছে সে খুব ভালো করেই জানে কিছুক্ষণ পর জোয়ারের পানি এসে এটা ভেঙে দিয়ে যাবে। এই জ্ঞানটুকু তার আছে। কিন্তু তাই বলে সে দুর্গ বানানো থামিয়ে দেয় না। এটি পালানোর পথ নয়। এটি হলো নিজের ইচ্ছাশক্তি বা উইল প্রয়োগ করে এমন একটা জীবন গড়া যা তাৎপর্যপূর্ণ, এমনকি যদি তা ক্ষণস্থায়ীও হয়। এখানেই মস্তিষ্ক এবং আত্মার, অর্থাৎ আমাদের সিন্যাপ্স এবং সোলের এক অপূর্ব সৃজনশীল সংগ্রাম পরিলক্ষিত হয়।

ব্যাপারটা এমন নয় যে আমি অমর হয়ে যাব। ব্যাপারটা হলো আমি জানি আমার অস্তিত্ব সসীম। কিন্তু এই সসীম সময়ের ভেতরেই আমি এমন কিছু তৈরি করব যা আমার কাছে অর্থবহ। এই মেনে নেওয়াটাই হলো কিয়েরকেগার্ডের সেই স্বাধীনতার মাথা ঘোরা পরিস্থিতিটাকে সাহসের সাথে মোকাবেলা করা। ছাদ থেকে লাফ না দিয়ে ছাদের ওপর দাঁড়িয়ে দূরের আকাশটাকে উপভোগ করা। যখন আমরা এই সত্যটাকে গ্রহণ করতে পারি, তখনই আমরা অন্যের উপর নির্ভর করা বা অন্যের ছায়ায় লুকানোর সেই মোহ থেকে বেরিয়ে আসতে পারি।

একজন চিরন্তন শিক্ষার্থী হওয়ার মূল লক্ষ্যই তো হলো এই মোহ বা ইল্যুশনগুলোর জাল ভেদ করতে পারা। অন্যের মাধ্যমে নিজের শূন্যতা পূরণের চেষ্টা না করে নিজেদের সৃজনশীলতার মাধ্যমে একটা অর্থবহ জগৎ তৈরি করা।

কিন্তু আজকের এই আধুনিক প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে একটা বিষয় নিয়ে ভাবতেই হচ্ছে। অটো র‍্যাংক বলেছিলেন শিল্প এবং সৃজনশীলতা চর্চাই আমাদের মৃত্যুর ভয়কে জয় করার এবং অর্থপূর্ণভাবে বাঁচার একমাত্র প্রকৃত উপায়। তবে বর্তমান যুগে আমরা আসলে কি করছি? যখন আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই আমাদের হয়ে ছবি আঁকছে, আমাদের হয়ে কবিতা লিখছে বা মুহূর্তের মধ্যে গান বানিয়ে দিচ্ছে, তখন কি আমরা আসলে আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র আদিম হাতিয়ারটি যন্ত্রের হাতে তুলে দিচ্ছি না?

সৃজনশীলতার এই অধিকার, এই বালি দিয়ে দুর্গ বানানোর আনন্দটুকু যদি আমরা যন্ত্রের কাছে পুরোপুরি সমর্পণ করে ফেলি, তবে মানুষের এই অস্তিত্বগত শাটআপনেস বা গুটিয়ে থাকার প্রবণতা ভবিষ্যতে আমাদের কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে? আমরা কি তবে সেই বহুতল ভবনের ছাদে দাঁড়িয়ে শূন্যতাকে মোকাবিলার শেষ হাতিয়ারটুকু হারিয়ে ফেলব? এই প্রশ্নটা সত্যিই আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আর এই ভাবনাটার মাঝ দিয়েই আমাদের অস্তিত্বের সন্ধান চলুক।

 




তথ্যসূত্রঃ

  1.  Becker, Ernest. (1973). The Denial of Death. New York: Free Press.
  2.  Kierkegaard, Søren. (1844). The Concept of Anxiety: A Simple Psychologically Orienting Deliberation on the Dogmatic Issue of Hereditary Sin. Translated by Reidar Thomte, Princeton University Press (1980). কিয়েরকেগার্ডের 'অ্যাংজাইটি' বা 'ড্রেড' সংক্রান্ত মূল ধারণাগুলো এই বই থেকে নেওয়া হয়েছে। এখানে তিনি স্বাধীনতার মাথা ঘোরা বা 'dizziness of freedom' এর কথা বলেছেন।
  3.  Rank, Otto. (1932). Art and Artist: Creative Urge and Personality Development. New York: Knopf. অটো র‍্যাংকের সৃজনশীলতা এবং মানুষের 'ক্যারেক্টার আর্মার' বা চরিত্রের বর্ম সম্পর্কিত আলোচনার জন্য এটি শ্রেষ্ঠ উৎস।
  4.  Rank, Otto. (1936). Will Therapy and Truth and Reality. New York: Knopf. মানুষের ইচ্ছাশক্তি (Will) এবং সত্যের সাথে তার লড়াই নিয়ে র‍্যাংকের গভীর পর্যবেক্ষণগুলো এই বইটিতে পাওয়া যায়।
  5.  Yalom, Irvin D. (1980). Existential Psychotherapy. New York: Basic Books. অস্তিত্বের সংকট এবং মৃত্যুর ভয় কীভাবে মানুষের মনে উদ্বেগ তৈরি করে, সেই বিষয়ে আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক রেফারেন্স হিসেবে এই বইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
  6.  Freud, Sigmund. (1920). Beyond the Pleasure Principle. ফ্রয়েডের নিজস্ব চিন্তাধারায় মৃত্যু এবং জীবনের তাড়নার দ্বন্দ্ব বোঝার জন্য এই গবেষণাপত্রটি প্রাসঙ্গিক।

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বাসের সাতকাহন: ভয় থেকে মহাজাগতিক একত্বের সন্ধানে

বিশ্বাসের সাতকাহন পেরিয়ে: সত্যের সন্ধানে ৭টি অকাট্য অধ্যায়

ধর্মগ্রন্থ ও আধুনিক বিজ্ঞান: একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক আলোচনা

শূন্য থেকে অসীম: সত্যের সন্ধানে এক আত্মিক যাত্রা

শেখ হাসিনার পতন এবং প্রভাবশালী শ্রেণীর ভূমিকা