লিলিথ: আদিম পৃথিবীর প্রথম বিদ্রোহী নারী এবং স্বাধীনতার অমর আখ্যান
আমরা সবাই ছোটবেলা থেকে অ্যাডাম এবং ইভের গল্প শুনে এসেছি। কিন্তু আপনি কি জানেন অ্যাডামের প্রথম স্ত্রী ইভ ছিলেন না? তার নাম ছিল লিলিথ। ইতিহাসের পাতা থেকে তার নাম খুব সুকৌশলে মুছে ফেলা হয়েছে। এর কারণ একটাই, তিনি পুরুষের সমান অধিকার চেয়েছিলেন এবং মাথা নত করতে অস্বীকার করেছিলেন।
প্রাচীন হিব্রু মিথলজি এবং
অ্যালফাবেট অফ বেন সিরা নামের প্রাচীন গ্রন্থে লিলিথের এই চমৎকার কাহিনীটি পাওয়া
যায়। সেখানে বলা হয়েছে, ঈশ্বর অ্যাডাম এবং লিলিথ দুজনকেই একদম একই মাটি দিয়ে একই
সময়ে তৈরি করেছিলেন। তাই লিলিথের দাবি ছিল একেবারে যুক্তিসঙ্গত ও স্পষ্ট। তিনি
অ্যাডামকে বলেছিলেন, আমরা দুজন একই উপাদানে তৈরি, তাই আমরা সমান, আমি কোনোভাবেই
তোমার নিচে থাকব না বা তোমার বশ্যতা স্বীকার করব না।
এরপর পিতৃতান্ত্রিক সমাজ তাকে
কী প্রতিদান দিল? সমাজ এক স্বাধীনচেতা নারীকে বানিয়ে দিল এক ভয়ঙ্কর ডাইনি। যুগে
যুগে লোককথায় প্রচার করা হলো লিলিথ রাতের বেলা পুরুষদের প্রলুব্ধ করেন, শিশুদের
হত্যা করেন এবং এক অশুভ প্রেতিনী হিসেবে ঘুরে বেড়ান। একজন প্রতিবাদী নারীকে সমাজ
এভাবেই দানবী বানিয়ে ইতিহাসের পাতায় চিরকালের জন্য খলনায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত
করল। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আসলে লিলিথকে ভয় পেয়েছিল। তারা ভয় পেয়েছিল যে, লিলিথের
গল্প জানলে অন্য নারীরাও হয়তো নিজেদের অধিকার নিয়ে সচেতন হয়ে উঠবে। তাই লিলিথকে
দানব বানিয়ে অন্যান্য নারীদের ভয় দেখানো হলো, যাতে তারা চুপচাপ সব মেনে নেয়।
লিলিথের এই গল্পটি আসলে নারী
স্বাধীনতার এক অত্যন্ত শক্তিশালী রূপক। তিনি পরাধীন হয়ে স্বর্গে থাকার চেয়ে কষ্টকর
স্বাধীনতাকে বেছে নিয়েছিলেন। তার এই সিদ্ধান্ত আমাদের শেখায় যে, আত্মসম্মান এবং
অধিকারের জন্য কখনো কখনো খুব কঠিন পথ বেছে নিতে হয়। তিনি নিজের শর্তে বাঁচার জন্য
চরম মূল্য চোকাতে দ্বিধা করেননি। তিনি প্রমাণ করেছিলেন যে, খাঁচা যতই সোনার হোক না
কেন, মুক্ত আকাশের স্বাদ তার চেয়ে অনেক বেশি দামি।
এবার একটু আমাদের বর্তমান সময়ের
কথা ভেবে দেখুন। হাজার হাজার বছর পেরিয়ে গেলেও সমাজের মানসিকতা কি খুব বেশি
বদলেছে? আজকের দিনেও যে নারীরা নিজেদের অধিকার নিয়ে কথা বলেন বা সমাজের চাপিয়ে
দেওয়া অবাস্তব নিয়মের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে বাঁচতে চান, সমাজ তাদের কী চোখে
দেখে? সমাজ আজও তাদের বেয়াদব, উচ্ছৃঙ্খল বা আধুনিক যুগের লিলিথ হিসেবে আখ্যা দেয়।
যে মেয়েটি অন্যায় মুখ বুজে সহ্য
না করে প্রতিবাদ করে, যে মেয়েটি বিয়ের পর নিজের ক্যারিয়ার এবং জীবন নিজের মতো করে
সাজাতে চায়, সমাজ তাকে অহংকারী বলে দাগিয়ে দেয়। আমরা আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়ানো
নারীদের ভয় পাই। সমাজ চায় মেয়েরা ইভের মতো বাধ্য হোক। আর কেউ লিলিথের মতো নিজের
অধিকারের কথা বললেই আমরা তার চরিত্র হনন করে তাকে দানব বানিয়ে সমাজ থেকে আলাদা করে
দিতে চাই।
কিন্তু ইতিহাস সবসময় সত্যের পক্ষে
কথা বলে। একটু গভীরভাবে ভেবে দেখলে বুঝবেন, আজ আমরা যে নারীদের দানব বানাচ্ছি বা
সমাজচ্যুত করার চেষ্টা করছি, ভবিষ্যতের সমাজ তাদেরকেই নারী স্বাধীনতার সত্যিকারের
আদর্শ হিসেবে মনে রাখবে। আজকের এই প্রতিবাদী নারীরাই আগামীকালের স্বাধীন ও
সমঅধিকারের পৃথিবীর শক্ত ভিত্তি গড়ে দিচ্ছেন। তারা হয়তো আজকের দিনে সমাজের চোখে
নিন্দিত, কিন্তু আগামীকালের ইতিহাসে তারাই হবেন সবচেয়ে বেশি বন্দিত।
লিলিথ আসলে কোনো অশুভ শক্তি নন। তিনি হলেন সেই প্রতিটি সাহসী নারী, যিনি অন্যের ছায়ায় না বেঁচে নিজের আলোয় উদ্ভাসিত হতে চান। লিলিথের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, স্বাধীনতার জন্য লড়াই করা কোনো অপরাধ নয়। যারা আজ সমাজের চোখে ডাইনি বা দানব, আগামীকালের পৃথিবী তাদেরকেই নারী জাগরণের অগ্রদূত হিসেবে স্যালুট জানাবে।
তথ্যসূত্র: এই লেখার ঐতিহাসিক
প্রেক্ষাপট এবং মিথলজিক্যাল তথ্যগুলো প্রখ্যাত নৃবিজ্ঞানী রাফায়েল পাতাইয়ের লেখা
'The Hebrew Goddess' বইয়ের 'লিলিথ' অধ্যায় এবং প্রাচীন ইহুদি গ্রন্থ 'অ্যালফাবেট অফ
বেন সিরা' (Alphabet of Ben Sira) থেকে সংগৃহীত। লিলিথের আধুনিক মূল্যায়নটি বর্তমান
সময়ের নারীবাদী দৃষ্টিকোণের আলোকে লেখা হয়েছে।
Comments
Post a Comment