ধর্মদর্শন, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং একনায়কতন্ত্রের গোলকধাঁধা: একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ

আমাদের পারিবারিক আড্ডায় আজও নব্বইয়ের দশকের সেই উত্তাল দিনগুলোর গল্প ফেরে। আমার দাদী বা বাবার মুখে শোনা সেইসব স্মৃতি কেবল ফেলে আসা সময়ের গল্প নয়, বরং আমাদের ভূ-রাজনৈতিক সংকটের এক জীবন্ত দলিল। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে কেন বারবার গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়ে এবং একনায়কতন্ত্র জেঁকে বসে, তার উত্তর খুঁজতে আমাদের কেবল বর্তমানের রাজনীতি নয়, বরং সমাজের গভীরে প্রোথিত ধর্মদর্শন ও মনস্তত্ত্বের দিকে তাকাতে হবে।

দর্শনের সংঘাত: পুতুল না কি স্বাধীন সত্তা?

রাষ্ট্রের শাসনকাঠামো কেমন হবে, তা অনেকাংশেই নির্ভর করে সেই সমাজের মানুষ নিজেকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করে তার ওপর। ইসলামি দর্শনের একটি জনপ্রিয় ব্যাখ্যা হলো— ‘আল্লাহ সর্বশক্তিমান এবং মানুষ তাঁর হুকুমের গোলাম’। দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে যখন এই ধারণাকে চরমভাবে প্রয়োগ করা হয়, তখন মানুষের মনে এই বিশ্বাস জন্মায় যে, মানুষ কেবল একটি ‘হাতের পুতুল’। তার নিজস্ব চিন্তা বা বিবেকের চেয়ে ওপর থেকে আসা ‘আদেশ’ পালন করাই পরম ধর্ম।

এই ‘পরম আনুগত্যের’ শিক্ষা যখন রাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হয়, তখন তা একনায়কতন্ত্রের জন্য উর্বর জমি তৈরি করে। কারণ, যে নাগরিক নিজেকে আদেশের দাস মনে করতে অভ্যস্ত, সে খুব সহজেই একজন শক্তিশালী রাজনৈতিক একনায়কের হুকুমকেও বিনাবাক্যে মেনে নেয়। বিপরীতে, ভারতের প্রেক্ষাপটে যদি আমরা দেখি, সেখানে অদ্বৈত বেদান্তের ‘অহং ব্রহ্মাস্মি’ (আমিই ব্রহ্ম) দর্শন মানুষকে শিখিয়েছে যে পরম সত্য মানুষের ভেতরেই বিরাজমান। এই আত্মিক শক্তিই মানুষকে কোনো রক্ত-মাংসের স্বৈরাচারের সামনে মাথা নত না করার সাহস দেয়। পশ্চিমা বিশ্বে ঠিক এই কাজটিই করেছে ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতা’ বা ‘Individual Liberty’-র ধারণা।

বাংলাদেশের ইতিহাস: একনায়কতন্ত্রের দীর্ঘ পরম্পরা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল একটি গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্রের স্বপ্ন নিয়ে। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি বারবার একনায়কতান্ত্রিক ও সামরিক শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়েছে:

  • শেখ মুজিবুর রহমান (১৯৭২-৭৫): স্বাধীনতার পর সংসদীয় গণতন্ত্র দিয়ে শুরু করলেও ১৯৭৫ সালে ‘বাকশাল’ গঠনের মাধ্যমে তিনি একদলীয় শাসন প্রবর্তন করেন, যা ছিল দেশের প্রথম বড় রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও একনায়কতন্ত্রের সূচনা।
  • জিয়াউর রহমান (১৯৭৫-৮১): এক অস্থির সময়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন জেনারেল জিয়া। সামরিক শাসনের মোড়কে প্রায় ৬ বছর তিনি দেশ শাসন করেন।
  • হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ (১৯৮২-৯০): রক্তপাতহীন অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে এরশাদ প্রায় ৯ বছর স্বৈরতান্ত্রিক কায়দায় দেশ পরিচালনা করেন। ১৯৯০-এর প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে তাঁর পতন ঘটে এবং ১৯৯১ সালে দেশ আবার সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় ফেরে।
  • শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসন (২০০৯-২০২৪): গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ দেখেছে এক আধুনিক একনায়কতন্ত্রের নগ্ন রূপ। উন্নয়নের আড়ালে ভোটাধিকার হরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং চরম দমন-পীড়নের মাধ্যমে শেখ হাসিনা একটি হাইব্রিড রেজিম বা ছদ্মবেশী একনায়কতন্ত্র কায়েম করেছিলেন। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার বিপ্লব তাঁর এই দীর্ঘ শাসনের অবসান ঘটায়, যা প্রমাণ করে যে মানুষ আর ‘পুতুল’ হয়ে থাকতে চায় না।

সামরিক জেনারেল ও লড়াইয়ের মনস্তত্ত্ব: দর্শনের প্রভাব

পাকিস্তান বা বাংলাদেশে কেন বারবার সামরিক জেনারেলরা ‘ত্রাতা’ হিসেবে আবির্ভূত হন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের সমাজের গভীরে প্রোথিত ধর্মদর্শনের একটি বিশেষ ব্যাখ্যার মধ্যে। ইসলামের রাজনৈতিক দর্শনে যখন ‘আল-হাকিমিয়্যাহ’ (আল্লাহর সার্বভৌমত্ব) বা কেবল ওপর থেকে আসা ‘হুকুম’ পালনের ওপর অতিমাত্রায় জোর দেওয়া হয়, তখন ব্যক্তির নিজস্ব বিচারবুদ্ধি গৌণ হয়ে পড়ে। এখানে ‘জাবারিয়া’ বা নিয়তিবাদের একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব কাজ করে—যেখানে মনে করা হয় মানুষ কেবল পূর্বনির্ধারিত ভাগ্যের দাস এবং তার প্রধান কাজ হলো আদেশ পালন করা।

যখন কোনো সমাজ জীবনকে কেবল একটি ‘সংগ্রাম’ বা নিরন্তর ‘জিহাদ’ (লড়াই) হিসেবে দেখতে শুরু করে, তখন তারা স্বভাবতই একজন লড়াকু সৈনিককে তাদের নেতা হিসেবে কল্পনা করে। যেহেতু আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় জীবনেও তারা নিজেদের এক ‘পরম কমান্ডারের’ সৈন্য হিসেবে ভাবে, তাই পার্থিব রাজনীতিতেও তারা সেনাপ্রধান বা জেনারেলদের মধ্যে সেই ছায়া খুঁজে পায়। শান্তির চেয়ে লড়াই যখন মুখ্য হয় এবং যখন মনে করা হয় যে বিরুদ্ধ মতকে দমন করাই শ্রেষ্ঠ পথ, তখন গণতন্ত্রের ধীরগতির আলোচনার চেয়ে বন্দুকের নলের তাৎক্ষণিক ‘ফয়সালা’ অনেক বেশি কার্যকর মনে হয়। এই মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বই বারবার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে এবং একনায়কতন্ত্রকে বৈধতা দিয়েছে।

সংখ্যালঘু সংকট ও আমাদের নৈতিক দ্বিচারিতা

একটি রাষ্ট্রের গণতন্ত্রের আসল পরীক্ষা হয় সেই দেশের সংখ্যালঘুদের অবস্থার ওপর। ১৯৫১ সালে বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৩%, যা ১৯৭১ সালে ১৩% এবং বর্তমানে মাত্র ৭-৮ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। এই পরিসংখ্যান আমাদের জন্য লজ্জাজনক।

আমরা যখন ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে সরব হই (যা অবশ্যই সঠিক), তখন নিজ দেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর হওয়া অত্যাচার নিয়ে নীরব থাকা হবে চরম ভণ্ডামি বা ‘হিপোক্রেসি’। ১৯৭১-এর গণহত্যা বা পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘুদের ওপর হওয়া জুলুমের কথা আমাদের পাঠ্যপুস্তকে বা জনপরিসরে এড়িয়ে যাওয়া হয়। আমরা যত বেশি এই সত্যগুলো গোপন করব, তত বেশি উগ্রবাদী শক্তি শক্তিশালী হবে।

উপসংহার

ধর্মদর্শন কোনো ক্ষুদ্র বিষয় নয়; এটি একটি জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু ধর্মকে যখন ‘দাসত্বের দর্শন’ হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং মানুষকে আদেশের গোলাম বানানো হয়, তখন রাষ্ট্র একনায়কতন্ত্রের চক্রে আটকা পড়ে। যতক্ষণ না আমরা বিশ্বাস করছি যে—আমার জীবন আমার নির্বাচনে চলবে, আমি কারো আদেশের দাস নই—ততক্ষণ প্রকৃত গণতন্ত্র আমাদের জন্য অধরাই থেকে যাবে। স্বৈরাচারের পতন কেবল রাজপথের লড়াইয়ে হয় না, তার জন্য প্রয়োজন চিন্তার জগতের এক আমূল পরিবর্তন।

 

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বাসের সাতকাহন: ভয় থেকে মহাজাগতিক একত্বের সন্ধানে

বিশ্বাসের সাতকাহন পেরিয়ে: সত্যের সন্ধানে ৭টি অকাট্য অধ্যায়

ধর্মগ্রন্থ ও আধুনিক বিজ্ঞান: একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক আলোচনা

শূন্য থেকে অসীম: সত্যের সন্ধানে এক আত্মিক যাত্রা

শেখ হাসিনার পতন এবং প্রভাবশালী শ্রেণীর ভূমিকা