এন্ড অফ দ্য লাইন: এক চিরন্তন ছাত্রের ডায়েরি

আমি নিজেকে ভাবি একজন চিরন্তন ছাত্র, যার কাছে এই মহাবিশ্বটা হলো এক বিশাল লাইব্রেরি, আর জীবনটা হলো সেই লাইব্রেরির সদস্যপদ।

মাঝে মাঝে ভাবি, এই যে আমরা পৃথিবীতে এলাম, দিনশেষে আমরা আসলে কী?


জীবন এবং 'এন্ড অফ দ্য লাইন'

ভিডিও গেম যারা খেলেছে, বিশেষ করে জিটিএ স্যান অ্যান্ড্রিয়াস—তারা জানে গেমের শেষ মিশনের নাম 'End of the Line'। সেই মিশনে অনেক ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া আর বিস্ফোরণের পর যখন সব শান্ত হয়, তখন সিজে (CJ) তার বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা দেয় আর ধীরলয়ে স্ক্রিনে নামগুলো ভেসে ওঠে—কারা গেমটা বানিয়েছে, কে মিউজিক দিয়েছে। আমার মনে হয় মৃত্যুটাও ঠিক তেমনই। জীবন নামের এই শেষ মিশনটা যখন পার হবে, তখন হয়তো আমাদের চোখের সামনেও একজোড়া 'ক্রেডিট রোল' ভেসে উঠবে। এক অদ্ভুত শান্তি নিয়ে আমরা দেখব আমাদের 'ডেভেলপার' এই গেমটা কতটা নিখুঁতভাবে সাজিয়েছিলেন। আমাদের আর কোনো ডিউটি থাকবে না, শুধু শান্ত হয়ে বসে থাকা।

আমাদের 'ডেভেলপার' ও কোডিংয়ের রহস্য

আমি প্রায়ই ভাবি, স্রষ্টা যদি চান তবে কেন দুনিয়ায় এত হানাহানি? উত্তরটা আমি খুঁজি প্রযুক্তি দিয়ে। একজন গেম ডেভেলপার যদি চান, তিনি এমনভাবে কোড করতে পারেন যেন গেমের কোনো ক্যারেক্টার কখনোই ভুল দিকে না যায় বা অপরাধ না করে। স্রষ্টাও আমাদের ভেতর থেকে 'খারাপ' করার সফটওয়্যারটা ডিলিট করে দিতে পারতেন।

কিন্তু তিনি তা করেননি। কেন? কারণ তিনি আমাদের কোনো 'পরীক্ষা' নিচ্ছেন না; তিনি আমাদের 'ডেভেলপ' করছেন। আমরা হয়তো এক অসীম বিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া একেকটা প্রোটোটাইপ, যারা প্রতিনিয়ত আরও উন্নত হওয়ার চেষ্টা করছে। তাই আমি 'নরক' বা 'শাস্তি'র ধারণায় বিশ্বাস পাই না। একজন ডেভেলপার তার সৃষ্টিকে ঘৃণা করতে পারেন না, তিনি কেবল তাকে আরও আপডেট করতে চান।

শক্তির রূপান্তর: আমি কি ঘাস হয়ে বেঁচে থাকব?

বিজ্ঞানের সেই সূত্রটা আমাকে খুব টানে—শক্তি কখনো শেষ হয় না। ভাবি, আমি যখন থাকব না, আমার এই শরীরটা মাটির সাথে মিশে যাবে। সেখান থেকে হয়তো একটা কচি ঘাস জন্মাবে, কিংবা একটা বিশাল বটগাছ। সেই গাছের ফল যখন কোনো পাখি খাবে, আমি তখন সেই পাখির ডানায় ভর করে আকাশে উড়ব। এভাবেই আমি বেঁচে থাকব এই মহাবিশ্বের কোনো না কোনো ফর্মে। মৃত্যু মানে তো ফুরিয়ে যাওয়া নয়, মৃত্যু মানে কেবল রূপ বদলে ফেলা।

আমার সবচেয়ে বড় ভয়: অজানার বিচ্ছেদ

সবাই যমরাজ বা আজরাইলকে ভয় পায়, কিন্তু আমার ভয়টা অন্য জায়গায়। আমার ভয় হয় এই ভেবে যে—আমি তো সবটা জানতে পারলাম না! পৃথিবীটা এত দ্রুত বদলাচ্ছে, প্রতিনিয়ত নতুন নতুন জ্ঞান জন্ম নিচ্ছে। আমি যদি আজ চলে যাই, তবে আগামী বিশ-ত্রিশ বছর পর মানুষ নতুন কী আবিষ্কার করল, মহাকাশের কোন রহস্য ভেদ হলো—সেগুলো তো আর আমার জানা হবে না। অজানাকে জানতে না পারার এই যে একতরফা বিচ্ছেদ, এটাই আমার কাছে মৃত্যুর সবচেয়ে বড় আক্ষেপ।

শেষ কথা

সক্রেটিস বলেছিলেন, তিনি শুধু এটাই জানেন যে তিনি কিছুই জানেন না। আমিও সেই দলেরই লোক। নীতি-নৈতিকতা বা ভালো মানুষ হওয়ার জন্য আমার কোনো আলাদা বাউন্ডারির দরকার নেই। আমি ভালো থাকি কারণ আমি জানি, আমরা সবাই একসুতোয় গাঁথা।

আমি আজীবন ছাত্র হয়েই থাকতে চাই। কারণ যেদিন আমার ভেতরের এই 'কেন' শব্দটা মরে যাবে, সেদিনই আমি প্রকৃত অর্থে মারা যাব। তার আগ পর্যন্ত, আসুন আমরা কেবল পড়ি, জানি এবং আরও বেশি কৌতূহলী হই।

 

Comments

Popular posts from this blog

বিশ্বাসের সাতকাহন: ভয় থেকে মহাজাগতিক একত্বের সন্ধানে

বিশ্বাসের সাতকাহন পেরিয়ে: সত্যের সন্ধানে ৭টি অকাট্য অধ্যায়

ধর্মগ্রন্থ ও আধুনিক বিজ্ঞান: একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও যৌক্তিক আলোচনা

শূন্য থেকে অসীম: সত্যের সন্ধানে এক আত্মিক যাত্রা

শেখ হাসিনার পতন এবং প্রভাবশালী শ্রেণীর ভূমিকা