কল্পনার ঈশ্বর ও মানুষের আত্মপ্রতারণা
এই কারণেই আমি বলি—আমরা কখনোই তাঁকে কল্পনা করতে পারি না।
আর ঠিক এই কারণেই কল্পনা করাটাই এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক অন্যায়।
যে সত্তাকে আমরা “অসীম”, “সর্বজ্ঞ”, “সর্বশক্তিমান” বলে দাবি করি, তাকে ধারণ করার মতো কোনো জৈবিক বা বৌদ্ধিক কাঠামো মানুষের নেই। মস্তিষ্ক হোক বা আত্মা—যাই নাম দিই না কেন—দুটোই সীমাবদ্ধ। সীমিত যন্ত্র দিয়ে অসীমকে ধরা যায় না; চেষ্টা করলেই সেখানে বিকৃতি ঘটে।
স্রষ্টাকে কল্পনা করার মুহূর্তেই আমরা তাঁকে মানবিক করে তুলি। চোখ দিই, রাগ দিই, করুণা দিই, ইচ্ছা দিই। এগুলো আসলে তাঁর গুণ নয়—এগুলো আমাদের। আমরা আমাদের মানসিক ছাঁচে তাঁকে ঢেলে দিই, তারপর সেই ছাঁচকেই সত্য বলে চালাই।
এইখানেই মূর্তি আর মানসিক কল্পনার পার্থক্য লুপ্ত হয়ে যায়। পাথরে গড়া দেবতা আর চিন্তায় গড়া দেবতার মধ্যে মৌলিক কোনো তফাৎ নেই। একটাতে হাত কাজ করে, অন্যটাতে কল্পনা—কিন্তু দুটোই মানুষের নির্মাণ।
আর যখন স্রষ্টা মানুষের কল্পনার পণ্য হয়ে ওঠে, তখন তিনি আর স্রষ্টা থাকেন না—তিনি হয়ে ওঠেন সাংস্কৃতিক অবজেক্ট। সমাজ যেমন চায়, সময় যেমন চায়, ক্ষমতা যেমন চায়—তাঁকেও তেমনভাবেই সংজ্ঞায়িত করা হয়।
অজ্ঞেয়বাদী দৃষ্টিতে, যদি কোনো সর্বোচ্চ সত্তা থেকেই থাকে, তবে তাকে জানার দাবি করাটাই অহংকার। আর নাস্তিক দৃষ্টিতে, এই কল্পনাগুলো আসলে মানুষের ভয়, অনিশ্চয়তা আর অর্থের খোঁজ থেকে জন্ম নেওয়া মানসিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
তাই ঈশ্বরকে কল্পনা করা হয়তো ভক্তি নয়—
এটা মানুষের নিজের সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার করার চেষ্টা।
হয়তো সবচেয়ে সৎ অবস্থান হলো এই স্বীকারোক্তি—
আমরা জানি না।
আর না জানাটাকেই সত্য হিসেবে মেনে নেওয়াই বুদ্ধিবৃত্তিক সততা।
Comments
Post a Comment