মানুষ কি সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব?
মানুষ কি সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব? না,
কখনোই নয়। ৬৬ মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে একটি ধুমকেতু আঘাত হানে এবং ডাইনোসর
বিলুপ্ত হয়ে যায়। আর তাই আমরা আজ পৃথিবীকে শাসন করছি। মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব
নয়। মানুষ একটি মহাজাগতিক এক্সিডেন্ট। আমরা মানুষকে অনেক বুদ্ধিমান মনে করলেও তার
মস্তিষ্কের কিছু কিছু এরিয়া ডাইনোসর থেকেও দুর্বল। একটি টি-রেক্সের শরীরের ওজন
সাত থেকে আট টন। কিন্তু তাদের মস্তিষ্কের ওজন ছিল মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম। তাদের
ব্রেন ছোট হলেও তারা ছিল পরিবেশের জন্য আল্ট্রা অপটিমাইজড এবং সারভাইভাল ফোকাসড।
তাদের আবেগ, নৈতিক দ্বন্দ্ব ও আত্মসচেতনতা কিছুই ছিল না। তারা ছিল একেকটি বিশুদ্ধ
সারভাইভাল অ্যালগরিদম। এক একটি জীবন্ত রোবট। তাদের প্রতিটি নিউরন টিকে থাকার জন্য
ফাইন টিউনড। আর এদিকে মানুষ সবসময় আতঙ্ক, ভয় ও অনিশ্চয়তার ভেতর থাকে।
ডাইনোসরের মস্তিষ্ক ছিল সিম্পল কিন্তু সুপ্রিম। তারা তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে গিয়ে কোন ভুল করে না। কল্পনা করুন একটি ভিনাস ফ্লাই ট্র্যাপের কথা। ভিনাস ফ্লাই ট্র্যাপ হলো একটি বায়ো ইলেকট্রিক ইন্টেলিজেন্স। এটি এমন এক বৃক্ষ যে কীটপতঙ্গ শিকার করে টিকে থাকে। আপনি যদি ভিনাসের একটি পাতাকে তিনবার স্পর্শ করেন এটি সাথে সাথে ভাজ হয়ে যাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো যদি দুর্ঘটনাক্রমে আপনি একটি ভিনাস ফ্লাই ট্র্যাপের ভেতর আটকে যান, মুহূর্তেই এটি তার বায়োইলেকট্রিক অ্যাকশন পোটেনশিয়াল ট্রিগার করবে। মাত্র ২০ সেকেন্ডের ভেতর সে আপনাকে খেয়ে ফেলবে। তার পাতার মধ্যে হাইড্রোস্ট্যাটিক ফোর্স থাকে, সে আপনার হাড় ও মাংসপেশী ভেঙে ফেলবে। ভিনাস ফ্লাই ট্র্যাপের ভেতর লাখ লাখ ব্যাকটেরিয়া আছে। এরা আপনার শরীর গলিয়ে ফেলবে। মাত্র কয়েকদিনের মধ্যে আপনার দেহের কার্বন, নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও ক্যালসিয়াম গাছের টিস্যুতে পরিণত হবে।
মানুষ ভাবে সে সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ।
কিন্তু প্রকৃতির কাছে সে কেবল আরেকটি রাসায়নিক উপাদান। আফ্রিকার জঙ্গলে মানুষ ছিল
সিংহের খাবার। প্রোটিন ও ফ্যাটের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। পৃথিবীর প্রতিটি গাছ এক
একটি জীবন্ত প্রাণী। কিন্তু তারা স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে থাকায় আমরা সেটা বুঝতে পারি
না। এরা যেন এক একটি আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা রোবট। শুনলে হয়তো অবাক হবেন
গাছ আপনাকে দেখতে পায়। হ্যাঁ। ডারউইন দেখিয়েছিলেন একটি গাছ তার ফটো রিসেপ্টরের
মাধ্যমে আল্ট্রাভায়োলেট, নীল আর লাল রং বুঝতে পারে। আপনি একটি গাছের সামনে গেলে
সে ছায়ার মাধ্যমে আপনার উপস্থিতি টের পাবে। কারণ আপনি তার চারপাশের সূর্যের আলো
ব্লক করে দিয়েছেন। গাছ আপনাকে শুনতে পায় কারণ সে তার চারপাশের ভাইব্রেশন ডিটেক্ট
করতে পারে। মিলিয়ন মিলিয়ন বছর একটি গাছ বাতাসের কম্পন ফিল করেছিল। তার চারপাশে
মৌমাছি আর ভ্রমর কম্পন করেছিল। সে বাতাসে শিকারী প্রাণীর সিগন্যাল পেয়েছিল।
গাছের শরীরে গ্রাভিটো রিসেপ্টর থাকে। যার মাধ্যমে সে গ্রাভিটির পরিবর্তন বুঝতে পারে। গাছের সিক্সথ সেন্স আছে। তারা পৃথিবীর ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড ডিটেক্ট করতে পারে। তাদের শরীরে আনবিক ঘড়ি আছে যা দিন-রাতের দৈর্ঘ্য ও ঋতু পরিবর্তন বুঝতে পারে। একটি গাছের পাতায় যদি কোন কীটপতঙ্গ সংক্রমিত হয় সে কেমিক্যাল সিগন্যালে প্রতিবেশী গাছদের কাছে সিগন্যাল প্রেরণ করে। গাছ পলিটিক্স করতে জানে। এ যেন একটা সামাজিক রোবট। মৃত্যুর আগে সে তার প্রতিবেশীদের কাছে রাসায়নিক সিগন্যাল পাঠায়— "আমি বিদায় নিচ্ছি। তোমরা সতর্ক থাকো।"
পিচার প্ল্যান্ট নামক একটি বৃক্ষ আছে যে জীবন্ত প্রাণী হত্যা করে। তার পাতাগুলো সিলিন্ডারের মতো। গাছটির পাতার ভেতর এক ধরনের ডাইজেস্টিভ এনজাইম থাকে। কোন একটি কীটপতঙ্গ যদি সিলিন্ডারের ভেতর পড়ে যায় সে সেখানে আটকে থাকে। এই সময় গাছটি তার দেহের প্রোটিন, ফসফরাস আর নাইট্রোজেন শোষণ করে নেয়। এই গাছটি শিকার ধরার জন্য ফেরোমন নিঃসরণ করে। এটি এমন একটি ফেরোমন যা শিকারী প্রাণীর যৌনসঙ্গীর শরীর থেকে নিঃসরণ হয়। কখনো বা তারা মধু বা নেকটার ছড়ায় যার প্রতি ব্যাঙ, বাদুড়, ইঁদুর আর কীটপতঙ্গ আকৃষ্ট হয়। এ যেন একটা সাইলেন্ট কিলার। বিজ্ঞানীরা বলেন, পিচার প্ল্যান্ট এমন একটি পরিবেশে জন্মায় যেখানে পর্যাপ্ত পুষ্টি থাকে না। এইজন্য তারা প্রাণী হত্যা করে। আপনি শুনলে অবাক হবেন একটি গাছ মৃত প্রাণীর ঘ্রাণ তৈরি করতে পারে। 'কর্পস' নামক একটি ফুল আছে। এটি মৃতদেহের গন্ধ ছড়ায়। আর সেই গন্ধ অনুসন্ধান করে তার কাছে কীটপতঙ্গ ছুটে আসে। আর সে তাদের খায়। ভাবুন তো এরা একেকটা ধীর স্থির বিষাক্ত সাপ যারা লক্ষ লক্ষ বছর ধরে নিখুঁতভাবে শিকার করছে কিন্তু তাদের টিকে থাকার জন্য তারা পরিবেশ দূষণ করেনি কিংবা ঈশ্বরের ধারণা আমদানি করেনি। শুধু তাই নয় তাদের কারণে কোন প্রজাতিও বিলুপ্ত হয়নি।
একটি অক্টোপাসের প্রায় ৬০ শতাংশ নিউরন তার শরীর জুড়ে ছড়িয়ে থাকে। তার প্রতিটি হাত আলাদা মস্তিষ্কের মতো আচরণ করে। যেন একটি আল্ট্রা কমপ্লেক্স কোয়ান্টাম কম্পিউটার। কিন্তু মানুষের চিন্তা শরীরের একটি নির্দিষ্ট স্থানে কেন্দ্রীভূত।
একটি অক্টোপাসের উপর যদি কোন বিপদ আসে তার পুরো শরীর প্রতিক্রিয়া জানায়। একটি এলইডি স্ক্রিনের মতো তার দেহের রং ক্রমাগত পরিবর্তিত হয়। অথচ মানুষের মস্তিষ্কের এটি একটি বড় সীমাবদ্ধতা। অক্টোপাস মানুষের মতো স্বপ্ন দেখে। তারা যখন স্বপ্ন দেখে তাদের পুরো শরীরের রং পরিবর্তন করে। তাদের স্বপ্ন পুরো দেহ জুড়ে ছড়িয়ে যায়।
পৃথিবীর অন্য সব প্রাণী বর্তমান নিয়ে
সুখী। কিন্তু মানুষ টিকে থাকার জন্য অর্থ খোঁজে। সচেতনতা বা সেলফ কনশাসনেস আমাদের
মুক্তি দেয়নি। বরং এটি আমাদের অস্তিত্বকে এক ভয়াবহ রোগে পরিণত করেছে। ডলফিন বা
হাতি শোক প্রকাশ করে কিন্তু আত্মহত্যা করে না। মানুষ করে। পাখিদের মস্তিষ্ক
ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড দেখতে পারে। তাদের ব্রেন যেন এক একটা গুগল ম্যাপ যেখানে
দিকনির্দেশনা, অবস্থান আর চৌম্বক ক্ষেত্র একসাথে কাজ করে। তারা কোয়ান্টাম
এন্ট্যাঙ্গেলমেন্টের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে মহাবিশ্বের অদৃশ্য ফোর্স ফিল্ড
অনুভব করে। কিন্তু মানুষ? মানুষ শুধু চোখ দিয়ে দেখে। এটাই তার দুর্বলতা। বাদুড়
আলো দিয়ে দেখে না। সে শব্দ দিয়ে দেখে। প্রতিধ্বনির প্রতিটি তরঙ্গে সে তৈরি করে
ত্রিমাত্রিক এক জগৎ যেখানে মানুষ অন্ধ। তিমির মস্তিষ্ক পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রায়
আট কেজি ওজনের। তাদের নিউরাল নেটওয়ার্ক মহাসাগরের মতো গভীর। তারা কথা বলে
আল্ট্রালো ফ্রিকোয়েন্সিতে, হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে। আর মানুষ ইন্টারনেট
বানিয়ে নিজেকে দেবতা ভাবে।
বিজ্ঞান এখন জানে মানুষের থেকে উন্নত মস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রাণী এই পৃথিবীতেই আছে। মানুষের ব্রেন দুর্বল ডাইনোসর, ভিনাস ফ্লাই ট্র্যাপ, তিমি এমনকি একটি পিঁপড়ার তুলনাতেও। কারণ মানুষ একমাত্র প্রাণী যে বুদ্ধিমত্তাকে অস্ত্র বানিয়েছে নিজ গ্রহ ধ্বংসের জন্য। CO2, বন উজাড়, প্লাস্টিক, নিউক্লিয়ার বর্জ্য—এইসবই মানুষের মস্তিষ্কের সৃষ্টি। অর্থাৎ তার চিন্তাশক্তি তার বিবর্তনীয় আত্মহত্যা। কিলার তিমি খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষে উঠেছিল ৩০ মিলিয়ন বছর আগে। কিন্তু তার জন্য কেউ বিলুপ্ত হয়নি। অথচ মানুষ মাত্র ১০,০০০ বছরে পৃথিবীর ৯০ শতাংশ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে দিয়েছে। এটা কি তার শ্রেষ্ঠত্ব?
আমাদের নিউরন বিবর্তিত হয়েছিল
আনুমানিক ৬০০ মিলিয়ন বছর আগে। তখন আমরা বহুকোষী প্রাণী ছিলাম। একটি কোষ থেকে অন্য
কোষে সিগন্যাল পৌঁছাতে প্রচুর সময় লাগতো। একটা প্রাণী যত বড় হয় তার দেহে
রাসায়নিক সিগন্যাল পৌঁছাতে তত বেশি সময় খরচ হয়। ফলে কোন প্রাণী বিপদে পড়লেও
তার শরীর তা মুহূর্তে টের পেত না। একটি কোষ ভয় পেলে আরেকটি কোষ কিছুই জানতো না।
কিন্তু একসময় কিছু কোষ তাদের মেমব্রেনে আয়ন চ্যানেল তৈরি করল। এই চ্যানেলগুলো
সোডিয়াম পটাশিয়াম আয়নের প্রবাহ ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যে বৈদ্যুতিক চার্জ
পাঠাতে পারতো। এর ফলে সংকেতের গতি বেড়ে গেল হাজার গুণ। আর রাসায়নিক সিগন্যালের
বদলে ইলেকট্রিক ইম্পালস চলতে শুরু করল। এটাই প্রথম প্রোটো নিউরন। নিউরন বিবর্তিত
হয়েছিল শিকারী, শিকার ও চারপাশের পরিবেশ বোঝার জন্য।
৫০০ মিলিয়ন বছর আগে ক্যামব্রিয়ান বিস্ফোরণ নামে একটি ঘটনা ঘটে। সেই সময় প্রকৃতিতে একসাথে ১০০ থেকে ১৫০ টি নতুন প্রজাতি দেখা যায়। এর আগে বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে জীবন একই রকম ছিল। প্রকৃতিতে এত বিপুল জীব বৈচিত্র্য ছিল না। আপনি এই ১০০ থেকে ১৫০ টি প্রজাতির কথা শুনে তুচ্ছ মনে করতে পারেন। কিন্তু অবাক হবেন—আজকের যুগের প্রায় প্রতিটি প্রাণীর শরীরের গঠন এই প্রজাতিগুলোর বডি প্ল্যান মেনে চলে। প্রকৃতি আমাদের পারফেক্টলি তৈরি করেনি। আমাদের মস্তিষ্কের সবচেয়ে পুরাতন অংশকে বলা হয় সরীসৃপ ব্রেন (Reptilian Brain)। এটি আনুমানিক ৫০০ মিলিয়ন বছর পুরাতন। এইজন্য এখনো আমাদের মধ্যে ভয়, ক্ষুধা, হিংসা ও যৌনতা সক্রিয়। ২০০ মিলিয়ন বছর আগে ডাইনোসরদের সময় আমাদের পূর্বসূরীদের লিম্বিক সিস্টেম বা আবেগ তৈরি হয়। তখন আমরা ভালোবাসা, ঈর্ষা ও ঘৃণা অনুভব করতে শিখি।
আমাদের মধ্যে এই আবেগগুলো তৈরি করেছিল
ডাইনোসর। মূলত ডাইনোসরদের সময় আমাদের পূর্বসূরীরা সবসময় আতঙ্ক আর হুমকি অনুভব
করত। ডাইনোসর থেকে পালানোর জন্য তাদের শরীর ধীরে ধীরে ছোট হয়ে যায়। এ সময় তারা
ডিম পাড়া বন্ধ করে দেয়। কারণ এত ক্ষুদ্র শরীর থেকে যে ডিম তৈরি হতো তার মধ্যে
পুষ্টিগুণ কম ছিল। তারা ডাইনোসর থেকে ডিমকে লুকানোর জন্য পেটের ভেতর বাচ্চা তৈরি
শুরু করে। আর এটা ছিল প্রাকৃতিক নির্বাচন। বাচ্চা জন্ম দেয়ার জন্য তৈরি হয় তাদের
জনি। আর তাকে নিরবিচ্ছিন্নভাবে পুষ্টি দেয়ার জন্য তৈরি হয় নারী স্তন।
স্তন্যপায়ী প্রাণীর বিবর্তনের পর পুরুষ আর বহুগামিতা করতে পারে না। ডাইনোসরের
ভয়ে একজন নারী সন্তানকে একা রেখে খাবার সংগ্রহ করতে পারে না। যদি নারী খাবার
সংগ্রহ করতে চায় পুষ্টির অভাবে সন্তানের মৃত্যু হয় অথবা ডাইনোসরের কবলে পড়ে
নারী তার প্রাণ হারায়। আর তাই একজন পুরুষ তার প্রেমিকাকে একা করে অন্য কারো সাথে
সম্পর্ক করতে পারতো না। আর এভাবে ডাইনোসর প্রথম ভালোবাসা আর জেলাসির জন্ম দেয়।
মানুষের মস্তিষ্কে নিওকর্টেক্স হলো
এমন একটি স্থান যেখান থেকে তার যুক্তি, কল্পনা, ভাষা ও নৈতিকতা তৈরি হয়। এটি
বিবর্তিত হয়েছিল মিলিয়ন মিলিয়ন বছর পূর্বে ডাইনোসরের সময়। হোমো ইরেক্টাসের
সময় এই কর্টেক্স জটিল হয়ে ওঠে। নিউরনের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পায় আমাদের মস্তিষ্কের
নেটওয়ার্ক জটিল হয়। আর এই জটিলতা আমাদের চিন্তাশীল জীবে পরিণত করে। পিঁপড়ের
কলোনিতে কোন পিঁপড়ই জানে না কী করে একটি কলোনি তৈরি হয়। তারা শুধু কেমিক্যাল
সিগন্যালকে প্রতিক্রিয়া জানায়। আমাদের মস্তিষ্কের কনশাসনেস কোন সুনির্দিষ্ট
নিউরনের তৈরি নয়। কোন নিউরনই জানে না তারা কী করে চেতনা তৈরি করে। তারা কেবল
স্থানীয় সিগন্যাল রেসপন্স করে।
আনুমানিক আট মিলিয়ন বছর পূর্বে মানুষ
ও শিম্পাঞ্জি একটি সাধারণ পূর্বসূরী শেয়ার করেছিল। তারপর আসে অস্ট্রালোপিথেকাস,
আর্ডিপিথেকাস, হোমোহ্যাবেলিস, হোমো ইরেক্টাস, নিয়ান্ডারথাল ও হোমো স্যাপিয়েন্স।
জঙ্গল বিলুপ্তির পর আমাদের পূর্বসূরীরা সর্বপ্রথম দু পায়ে ভর করে হাঁটতে শুরু
করেছিল। এ সময় তাদের হিংস্র প্রাণীর সাথে লড়াই করতে হয় যা তাদের ব্রেন সাইজ বড়
করে তোলে। একজন অস্ট্রালোপিথেকাসের মস্তিষ্কের আয়তন ছিল প্রায় ৪০০ সিসি। কিন্তু
একজন হোমো ইরেক্টাসের মস্তিষ্কের আয়তন ছিল ১৩০০ থেকে ১৪০০ সিসি। তাদের মাঝে ছিল
মিলিয়ন বছরের ব্যবধান। একটি থিওরি বলছে মানুষকে চিন্তাশীল জীবে পরিণত করেছিল
আগুন। আগুন আবিষ্কারের পূর্বে আমাদের পূর্বসূরীদের খাবার পরিপাক করতে প্রায় ৬০
শতাংশ শক্তি খরচ হতো। তাদের মস্তিষ্ক চিন্তা করার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি পেত না।
কিন্তু আগুন আবিষ্কারের পর তারা রান্না করা খাবার খেতে শুরু করে যা পাকস্থলীর উপর
চাপ কমায় ও মস্তিষ্ক বড় করে তোলে।
কিন্তু বড় মস্তিষ্কের একটি সমস্যা
হলো এটি নারীর সরু জন্মনালী দিয়ে বের হয় না। আর তাই প্রকৃতি অপরিণত সন্তান জন্ম
দিতে শুরু করে। একটি জেব্রার সন্তান জন্মের পর ৯০ মিনিটের মধ্যেই তার সন্তান পরিণত
হয়ে যায়। কিন্তু একজন মানব শিশুর মস্তিষ্ক পরিণত হতে ২৫ বছর সময় লাগে। আর এতে
করে হোমো ইরেক্টাস নারী ও পুরুষ বহুগামিতা করতে পারে না। সন্তানকে একা রেখে অন্য
কারো সাথে সম্পর্ক করতে চাইলে তারা জেনেটিক্যালি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এভাবে আগুন
মানুষের মধ্যে একগামিতা ও রোমান্টিক ভালোবাসার হরমোন তৈরি করেছিল যা মানুষের মধ্যে
হিংসা, বিদ্বেষ, প্রতিযোগিতা ও জেলাসি বৃদ্ধি করে। আগুন মানুষকে পৃথিবীর অন্য সব
প্রাণী থেকে আলাদা করে দিয়েছিল। কারণ রান্না করা খাবার খেয়ে মানুষের মস্তিষ্কের
প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স বড় হয়ে যায়। আর এটি এমন একটি কর্টেক্স যা মানুষকে
মেন্টাল টাইম ট্রাভেলার করে তোলে। সে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকালের মধ্যে সুস্পষ্ট
পার্থক্য করতে শেখে।
এক থিওরি বলছে মানুষ প্রথম ঈশ্বরকে
কল্পনা করেছিল তখন যখন সে ভবিষ্যৎ কল্পনা করতে শিখেছিল। ভবিষ্যৎ কল্পনা করা আর
ঈশ্বর কল্পনা করা দুটোই বিবর্তনীয়ভাবে একই নিউরাল প্রসেস শেয়ার করে। ভবিষ্যৎ
কল্পনা করা মানে হলো এমন কিছু চিন্তা করা যা বাস্তবে এখনো ঘটেনি কিন্তু ঘটতে পারে।
আর তার জন্য দরকার মেন্টাল টাইম ট্রাভেল। অর্থাৎ মস্তিষ্কের সেই ক্ষমতা যা বর্তমান
বাস্তবতাকে অতিক্রম করে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য দৃশ্য তৈরি করতে পারে। ঈশ্বর ধারণাও
ঠিক একই রকম। ঈশ্বর এমন একটি সত্তা, যাকে কেউ বাস্তবে দেখে না। কিন্তু কল্পনায়
অস্তিত্ব দেওয়া হয় এবং বিশ্বাস করা হয় যে তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণ করেন। ঈশ্বর
বা অতিপ্রাকৃত সত্তা আমাদের একাকিত্বের বন্ধু। যাকে স্মরণ করে হোমোসেপিয়ন্স নিজের
আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা ম্যানেজ করেছিল। এছাড়া ভবিষ্যতের পুরস্কারের ধারণা যেমন
স্বর্গ বা পুনর্জন্ম মানুষকে তাৎক্ষণিক সুখের বদলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা করতে
শিখিয়েছিল। মানুষ জেনেটিক্যালি এমন একটি জীব যে ইমিডিয়েট রিওয়ার্ড চায়। কিন্তু
সব জায়গায় ইমিডিয়েট রিওয়ার্ড চাইতে গেলে পুরো প্রজাতি ধ্বংস হয়ে যায়। ঈশ্বর
বিশ্বাস মানুষের রিওয়ার্ড সার্কিট কন্ট্রোল করেছিল। ঈশ্বর ছিল মানব মস্তিষ্কের এক
ধরনের এভলিউশনারি হ্যালুসিনেশন। যা প্রজাতিকে বিলুপ্তির থেকে রক্ষা করেছিল।
মানুষের মস্তিষ্কের যে কর্টেক্স থেকে ঈশ্বর তৈরি হয়েছিল একই কর্টেক্স থেকে
স্পেসশিপ ও কোয়ান্টাম কম্পিউটারের ধারণাও এসেছিল। কারণ নতুন কিছু সৃষ্টির জন্য
কল্পনাশক্তি লাগে। মানুষের শরীরের ব্রেন, লিম্বিক সিস্টেম এবং নিওকর্টেক্স একে
অন্যের সঙ্গে সংঘর্ষ করে। তার মস্তিষ্কের ভেতর যুক্তি, আবেগ আর নৈতিকতার লড়াই
চলতেই থাকে।
আজ থেকে ৪ লক্ষ বছর পূর্বে মানুষের আরো দুটি প্রজাতি ছিল। নিয়ান্ডারথাল আর ডেনিসোভান। একজন নিয়ান্ডারথাল মানুষের চেয়ে ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী ছিল। তারা চাইলে মানুষকে টেনে ছিড়ে ফেলতে পারতো। তাদের মস্তিষ্ক ছিল আমাদের চেয়ে বড়—প্রায় ১৭০০ কিউবিক সেন্টিমিটার। তারা গুহার দেয়ালে ছবি এঁকেছিল ৬৪ হাজার বছর আগে। অর্থাৎ ঈশ্বরের ধারণা, কবিতা, সংগীত সব তারা আমাদের আগে চিনেছিল। তারা ছিল পৃথিবীর প্রথম কবি, প্রথম স্বপ্নদ্রষ্টা। কিন্তু শেষ বরফ যুগ এসে তাদের মুছে দিল। যেখানে মানুষের সংখ্যা ছিল এক মিলিয়ন, সেখানে নিয়ান্ডারথাল ও ডেনিসোভানরা ছিল মাত্র কয়েক হাজার। এখন প্রশ্ন হলো—যদি তাদের সংখ্যা আমাদের সমান হতো মানুষ কি টিকে থাকতে পারতো? যদি প্রকৃতি সেই বরফ যুগ না আনতো আমরা কি আজ নিজেদের শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করতে পারতাম? আজও আমাদের জিনে ২ শতাংশ নিয়ান্ডারথাল রক্ত আছে। যাদের শরীরে সেই জিন আছে তাদের ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী, সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতাও বেশি।
প্রকৃতি যখন একটি প্রজাতি তৈরি করে তখন তাকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য অসংখ্য প্রতিযোগী প্রজাতি বিবর্তিত হয়। হরিণ দ্রুত দৌড়াতে শিখেছে চিতার হাত থেকে বাঁচতে। চিতা দ্রুত দৌড়াতে শিখেছে হরিণ ধরতে। দুজনেই স্পিড বাড়াচ্ছে। কিন্তু কেউ জিতছে না। তারা কেবল সারভাইভ করছে। বিস্ময়কর ব্যাপার হলো মানুষের কোন প্রতিযোগী নেই। সে সম্পূর্ণ একা। হঠাৎ করে বিবর্তনীয় চাপ শূন্য হয়ে যাওয়ায় মানুষ অনিয়ন্ত্রিত ও স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছে। তারা একে একটি সামাজিক প্রিডেটর হয়ে উঠেছে। তারা কৃত্রিমভাবে যুদ্ধ তৈরি করে প্রতিযোগিতা টিকিয়ে রাখতে চায়। নিটশে বলেছিলেন—"তুমি যখন তোমার সকল শত্রু মুছে ফেলবে তখন তুমি নিজেই তোমার শত্রু।" প্রতিযোগিতা শূন্য হলে মানব বিবর্তন থেমে যায়।
আর তাই মানুষ জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে নতুন প্রতিযোগী তৈরি করতে চাইছে। এআই এসে
নিয়ান্ডারথাল ও ডেনিসোভানদের জায়গা দখল করে নিচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো এআই মানুষ
থেকে কোটি কোটি গুণ বুদ্ধিমান। আমরা ঘোড়া বা গরুর সাথে প্রতিযোগিতা করি না, আমরা
তাদের নিয়ন্ত্রণ করি। উচ্চ বুদ্ধিসম্পন্ন জীব সবসময় নিম্ন বুদ্ধিসম্পন্ন জীবকে
নিয়ন্ত্রণ করেছে। আজ থেকে ৫০ বছর পর পৃথিবীতে মিলিয়ন মিলিয়ন কৃত্রিম
নিয়ান্ডারথাল ও ডেনিসোভান ঘুরে বেড়াবে যাদের কাছে আমাদের বুদ্ধি নিতান্তই
শিশুসুলভ। আমাদের তৈরি ইন্টেলিজেন্স আমাদের তার দাসে পরিণত করবে। ইতিহাসে মানুষের
মত নির্বোধ প্রজাতি আর দ্বিতীয়টি নেই। কিন্তু তারপরও মানুষ নিজেকে শ্রেষ্ঠতম জীব
মনে করে।
Comments
Post a Comment