ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূল ও টেকসই পুনর্বাসন: ‘প্রজেক্ট মর্যাদা’ (Project: Dignity) — একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধান
ভিক্ষাবৃত্তি নির্মূল ও টেকসই পুনর্বাসন:
‘প্রজেক্ট মর্যাদা’ (Project: Dignity)
— একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় মাস্টারপ্ল্যান
রাস্তার
সিগন্যালে গাড়ি থামলেই একঝাঁক
হাত জানালার কাছে চলে আসে।
আমরা অভ্যাসবশত বা করুণা করে
১০-২০ টাকা বের
করে দিই। আমরা ভাবি
পুণ্য করছি, কিন্তু গভীরে তাকালে দেখা যায়—এই
টাকাই হয়তো কোনো কিশোরকে
মাদক কিনতে সাহায্য করছে অথবা কোনো
শক্তিশালী সিন্ডিকেটের পকেট ভারী করছে।
বাংলাদেশে
ভিক্ষাবৃত্তি এখন আর নিছক
দারিদ্র্য নয়, এটি একটি
পদ্ধতিগত সমস্যা এবং কয়েকশ কোটি
টাকার "ক্যাশ বিজনেস"। এই সমস্যার
মূলে হাত দিতে আমাদের
প্রয়োজন একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
আপনাদের সামনে তুলে ধরছি ‘প্রজেক্ট
মর্যাদা’ — যার মূল দর্শন:
"সহানুভূতি নয়, সুযোগ এবং ভিক্ষা নয়, বিনিময়।"
১. নগদ টাকার লেনদেন: সমস্যার মূল উৎস
ভিক্ষাবৃত্তি টিকে
থাকে
মানুষের তাৎক্ষণিক দয়ার
ওপর।
যখন
একজন
ভিক্ষুক সহজেই
দিনে
৫০০-৭০০ টাকা আয়
করে,
তখন
সে
কঠোর
পরিশ্রম করতে
চায়
না।
আরও
ভয়াবহ
ব্যাপার হলো,
এই
টাকার
একটি
বড়
অংশ
চলে
যায়
মাদকের
পেছনে
কিংবা
ভিক্ষা
ব্যবসার মূল
হোতা
সিন্ডিকেটগুলোর পকেটে।
আমাদের সমাধান: সেন্ট্রাল রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (CRM) ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করতে হলে
সবার
আগে
রাস্তায় নগদ
টাকা
দেওয়া
বন্ধ
করতে
হবে।
- ডোনেশন
গেটওয়ে: সাধারণ মানুষ রাস্তায় কাউকে টাকা না দিয়ে একটি নির্দিষ্ট
কিউআর কোড (QR Code) বা নম্বরে টাকা পাঠাবে।
- স্বচ্ছতা
ও অডিট: এই টাকা সরাসরি একটি ট্রাস্টে
জমা হবে, যা সরকার অনুমোদিত এনজিও (NGO) দ্বারা পরিচালিত হবে। প্রতিটি পয়সার হিসাব থাকবে এবং তা নিয়মিত অডিট করা হবে।
- সচেতনতা: "আপনার ১০ টাকা একজনের মাদক কেনার পথ প্রশস্ত করছে, বরং এই টাকা ফান্ডে দিন যা তার জীবন বদলাবে" — এই স্লোগান নিয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা হবে।
·
ডিজিটাল স্বচ্ছতা (Blockchain Technology):
মানুষের মনে
প্রশ্ন
থাকে—"আমার টাকা কি
সঠিক
জায়গায়
যাচ্ছে?"
এই
সংশয়
দূর
করতে
প্রতিটি পয়সার
হিসাব
একটি
রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ডে থাকবে।
দাতা
অ্যাপের মাধ্যমে দেখতে
পাবেন
তার
১০
টাকায়
আজ
কতজন
ভিক্ষুকের খাবারের ব্যবস্থা হয়েছে।
·
সচেতনতা ক্যাম্পেইন: "আপনার ১০ টাকা
একজনের
মাদক
কেনার
পথ
প্রশস্ত করছে,
বরং
এই
টাকা
ফান্ডে
দিন
যা
তার
জীবন
বদলাবে"
—এই
প্রচারণায় সাধারণ
মানুষকে মানসিকভাবে যুক্ত
করতে
হবে।
২. ভিক্ষুক শ্রেণীকরণ (The
Classification Matrix)
রাস্তা
থেকে ভিক্ষুকদের তুলে এনে সরাসরি
জেলে বা আশ্রমে পাঠানো
কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। তাদের প্রয়োজন
অনুযায়ী ভাগ করতে হবে:
ক.
অক্ষম ও প্রবীণ (The Vulnerables)
যারা
শারীরিক বা মানসিকভাবে কাজ
করতে অক্ষম। এদের জন্য থাকবে
"শান্তিনিবাস"। এটি কোনো
জেল নয়, বরং একটি
আনন্দময় আশ্রয়কেন্দ্র যেখানে তাদের খাবার, চিকিৎসা এবং গান-বাজনা-
ধর্মীও বা বিনোদনের ব্যবস্থা থাকবে।
খ.
পেশাদার ও সামর্থ্যবান (The Professionals)
যারা
সুস্থ হয়েও ভিক্ষাকে পেশা
বানিয়েছে। এদের জন্য মডেল
হবে— "শ্রমের বিনিময়ে
সুবিধা"। রাস্তা পরিষ্কার,
বাগান করা বা ট্রাফিক
সচেতনতার মতো ছোট ছোট
কাজ করলে তবেই তারা
ওই ফান্ডের খাবার ও আশ্রয়ের সুযোগ
পাবে। অর্থাৎ, অলস বসে খাওয়ার
কোনো সুযোগ থাকবে না।
গ.
মাদকাসক্ত (The
Addicts)
এরাই
এই সিস্টেমের সবচেয়ে বড় বাধা। এদের
জন্য থাকবে বিশেষায়িত রিহ্যাব সেন্টার। কেবল চিকিৎসা নয়,
এখানে গুরুত্ব পাবে "আর্ট থেরাপি"। খেলনা তৈরি,
কুটির শিল্প বা পেইন্টিংয়ের মতো
সৃজনশীল কাজে তাদের ব্যস্ত
রাখা হবে। তাদের উৎপাদিত
পণ্য বাজারে বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ
তাদের নামেই জমানো হবে, যা তারা
সুস্থ হয়ে মূল জীবনে
ফেরার সময় মূলধন হিসেবে
পাবে।
৩. লুপহোল বন্ধ করার কৌশল
(Plugging the Loopholes)
অনেকে
প্রশ্ন করতে পারেন— "টাকা
না দিলে কি এরা
ছিনতাই বা সন্ত্রাস শুরু
করবে না?" এই ঝুঁকি বন্ধ
করার জন্য আমাদের বিশেষ
অস্ত্র আছে:
ক. মেরিট পয়েন্ট সিস্টেম: মনস্তাত্ত্বিক রূপান্তর
টাকা
না দিলে কি অপরাধ
বা সন্ত্রাস বাড়বে? এই ভয় দূর
করতে আমরা নিয়ে আসছি
‘রিওয়ার্ড লুপ’:
প্রতিটি পুনর্বাসিত ব্যক্তিকে একটি ডিজিটাল আইডি
কার্ড দেওয়া হবে।
·
সকালে
কাজে আসা, সময়মতো মাদক
ত্যাগ করা এবং শৃঙ্খলার
জন্য তারা 'মেরিট পয়েন্ট' পাবে।
·
বেশি
পয়েন্ট মানে— উন্নত মানের খাবার, আরামদায়ক বিছানা এবং নির্দিষ্ট সময়
পর পর পরিবারের সাথে
দেখা করার সুযোগ।
·
পয়েন্ট
কমলে সুযোগ-সুবিধাও কমবে। এটি তাদের মধ্যে
অপরাধ করার বদলে ভালো
হওয়ার একটি সুস্থ প্রতিযোগিতা
তৈরি করবে।
খ.
সিন্ডিকেট ও মাফিয়া দমন
যখন
পাবলিক রাস্তায় টাকা দেওয়া বন্ধ
করে দেবে, তখন মাফিয়াদের মুনাফা
বন্ধ হয়ে যাবে। পেশাদার
ভিক্ষুকদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি
ব্যবস্থা নেওয়া হবে যাতে তারা
পুনরায় সিন্ডিকেট তৈরি করতে না
পারে।
গ. হিজড়া ও বিশেষ জনগোষ্ঠীর
অন্তর্ভুক্তি
হিজড়াদের
সামাজিক মর্যাদা ফিরিয়ে দিতে তাদের ট্রাফিক
নিয়ন্ত্রণ বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের
সিকিউরিটি সার্ভিসে নিয়োগ দেওয়া হবে। এতে তারা
নির্দিষ্ট বেতনে সম্মানের সাথে কাজ করবে
এবং চাঁদাবাজির পথ পরিহার করবে।
৪. দক্ষতা উন্নয়ন ও 'প্রজেক্ট মর্যাদা'
ব্র্যান্ড
পুনর্বাসন
কেন্দ্রে থাকা ব্যক্তিদের দক্ষ
জনশক্তিতে রূপান্তর করাই আমাদের লক্ষ্য।
·
শিশুদের
জন্য: ১৫ বছরের কম
বয়সীদের জন্য বাধ্যতামূলক সাধারণ
ও কারিগরি শিক্ষা।
·
উৎপাদনশীলতা:
বড়রা তৈরি করবে পরিবেশবান্ধব
ব্যাগ, খেলনা, মোমবাতি বা কসমেটিকস।
·
বাজার
সংযোগ (Market
Linkage): এই পণ্যগুলো "Project Dignity"
ব্র্যান্ডের অধীনে সুপারশপগুলোতে আলাদা কর্নারে বিক্রি করা হবে। বড়
বড় দেশীয় ব্র্যান্ডের (যেমন- আড়ং বা এপেক্স)
সাথে কোয়ালিটি কন্ট্রোল পার্টনারশিপ থাকবে। মানুষ যখন জানবে এই
পণ্যটি কিনলে একজন মানুষের জীবন
বদলাচ্ছে, তখন তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে
তা কিনবে।
৫. ফিন্যান্সিয়াল মডেল: কেন এটি সফল
হবে?
প্রকল্পটি
পুরোপুরি সরকারি বাজেটের ওপর নির্ভরশীল হবে
না।
·
CSR ফান্ড:
বিভিন্ন বড় কোম্পানি তাদের
লভ্যাংশের একটি অংশ (Corporate Social Responsibility) এখানে ইনভেস্ট করবে।
·
পাবলিক
সাপোর্ট: মানুষ যখন সরাসরি পরিবর্তন
দেখবে— যে শিশুটি ভিক্ষা
করত সে আজ স্কুলে
যাচ্ছে— তখন তারা স্বেচ্ছায়
দান বাড়াবে।
·
স্বয়ংসম্পূর্ণতা:
তাদের তৈরি পণ্য বিক্রির
লভ্যাংশ থেকেই সিস্টেমটি একসময় নিজেই নিজের খরচ চালাতে পারবে।
কেন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই মডেলে টাকা
দেবে?
আন্তর্জাতিক
সংস্থাগুলো সাধারণত নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য বা
SDGs (Sustainable Development
Goals) নিয়ে কাজ করে। আপনার
মডেলে এমন কয়েকটি গোল
আছে যা সরাসরি তাদের
এজেন্ডার সাথে মিলে যায়:
·
SDG 1 (No Poverty): দারিদ্র্য
বিমোচন।
·
SDG 8 (Decent Work and Economic Growth): কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
·
SDG 10 (Reduced Inequalities): বৈষম্য দূরীকরণ
(বিশেষ করে হিজড়া বা
থার্ড জেন্ডার পুনর্বাসন)।
·
SDG 3 (Good Health and Well-being): মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও রিহ্যাব।
ফিন্যান্স মডেলে তাদের ভূমিকা (How to Involve Them)
ক.
ম্যাচিং ফান্ড (Matching Fund) মডেল:
আপনি
যখন সাধারণ মানুষের কাছ থেকে (বিকাশ/কিউআর কোড দিয়ে) ১
কোটি টাকা ডোনেশন তুলবেন,
তখন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সাথে চুক্তি থাকবে
যে— "পাবলিক যত
টাকা দেবে, সংস্থাগুলো সমপরিমাণ (১:১) টাকা ফান্ডে যোগ করবে।" এতে ফান্ডের আকার
দ্বিগুণ হয়ে যাবে এবং
সাধারণ মানুষও দান করতে বেশি
উৎসাহিত হবে।
খ.
টেকনিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ও স্কিল ট্রেনিং:
আন্তর্জাতিক
শ্রম সংস্থা (ILO) বা UNDP সরাসরি
টাকা না দিয়ে তাদের
ট্রেইনারদের পাঠাতে পারে। তারা ভিক্ষুকদের এমন
আন্তর্জাতিক মানের কাজ (যেমন: হাই-কোয়ালিটি হস্তশিল্প বা টেকনিক্যাল কাজ)
শেখাবে যা বিদেশে রপ্তানি
করা সম্ভব।
গ.
ট্রান্সপারেন্সি অডিট (স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ):
এনজিও-র দুর্নীতির যে
“লুপহোল” তা বন্ধ করতে
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সহায়ক হবে। তারা একটি
থার্ড-পার্টি মনিটরিং সিস্টেম চালু করবে। মানুষ
যখন জানবে যে এই প্রজেক্টটি
UNICEF বা World Bank মনিটর
করছে, তখন তাদের আস্থার
জায়গা ১০ গুণ বেড়ে
যাবে।
মডেলটিকে নিখুঁত করার নতুন পদক্ষেপ
(Optimization Strategies)
প্রজেক্টটিকে
টেকসই এবং দুর্নীতিমুক্ত করতে
আমরা নিচের কৌশলগুলো যুক্ত করছি:
·
যাকাত
ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা: কেবল এনজিও নয়,
এলাকার মসজিদ ও মন্দিরগুলোকে এই
ফান্ডের সাথে যুক্ত করা
হবে। খতিব সাহেবরা জুমার
খুতবায় জনগণকে সচেতন করবেন যেন তারা রাস্তায়
টাকা না দিয়ে এই
সিস্টেমের মাধ্যমে যাকাত বা দান প্রদান
করেন।
·
কর্পোরেট
পার্টনারশিপ:
পুনর্বাসন কেন্দ্রের ব্যক্তিদের তৈরি পণ্য কেবল
দয়ার ওপর ভিত্তি করে
বিক্রি হবে না। নামী
ব্র্যান্ডগুলোর (যেমন- আড়ং বা অন্যান্য
দেশীয় ব্র্যান্ড) সাথে চুক্তি করা
হবে, যাতে পণ্যের মান
নিশ্চিত হয় এবং তারা
সরাসরি বাজার পায়।
·
পাইলট
প্রজেক্ট ও ক্রমান্বয় বাস্তবায়ন: পুরো দেশে একসাথে
শুরু না করে প্রথমে
একটি নির্দিষ্ট এলাকা (যেমন: গুলশান বা উত্তরা) থেকে
শুরু করা হবে। সেখানকার
মডেল সফল হলে তা
সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া
হবে।
·
মানবাধিকার
রক্ষা: রিহ্যাব বা ক্যাম্পে যেন
কোনো ধরনের নির্যাতন না হয়, তা
তদারকি করার জন্য একটি
স্বাধীন কমিটি থাকবে, যা পুনর্বাসিত ব্যক্তিদের
অধিকার নিশ্চিত করবে।
দক্ষতা উন্নয়ন: ‘প্রজেক্ট মর্যাদা’ ব্র্যান্ড
পুনর্বাসিত
ব্যক্তিদের কারিগরি শিক্ষা দিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে
রূপান্তর করা হবে। ১৫
বছরের কম বয়সীদের জন্য
থাকবে বাধ্যতামূলক শিক্ষা। বড়রা তৈরি করবে
হস্তশিল্প, খেলনা বা পরিবেশবান্ধব পণ্য,
যা "Project Dignity" ব্র্যান্ডের অধীনে বাজারজাত করা হবে।
আইনি সুরক্ষা (The Dignity Act): এই পুরো
মডেলটিকে বাস্তবে রূপ দিতে এবং
মাফিয়া বা রাজনৈতিক বাধা
থেকে রক্ষা করতে একটি শক্তিশালী
আইনি কাঠামো প্রয়োজন। একে আমরা বলতে
পারি 'দ্য মর্যাদা
অ্যাক্ট' (The
Dignity Act)। এই আইনটি কেবল
ভিক্ষাবৃত্তি নিষিদ্ধ করবে না, বরং
রাষ্ট্রকে বাধ্য করবে ভিক্ষুকদের পুনর্বাসন
নিশ্চিত করতে।
১. ভিক্ষাবৃত্তির সংজ্ঞায়ন ও পুনর্বাসন অধিকার
এই
আইনের অধীনে ভিক্ষাবৃত্তিকে কেবল অপরাধ হিসেবে
না দেখে একটি 'সামাজিক
জিম্মিদশা' হিসেবে দেখা হবে।
·
অধিকার:
আইনের মূল কথা হবে—
"প্রত্যেক ভিক্ষুকের অন্ন, বস্ত্র ও আশ্রয়ের অধিকার
আছে, যা রাষ্ট্র 'প্রজেক্ট
মর্যাদা'র মাধ্যমে নিশ্চিত
করবে।"
·
বাধ্যবাধকতা:
কোনো ব্যক্তি যদি সক্ষম হওয়া
সত্ত্বেও পুনর্বাসনের সুযোগ গ্রহণ না করে রাস্তায়
ভিক্ষা করে, তবেই তা
দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে।
২.
নগদ অর্থ লেনদেনে নিষেধাজ্ঞা
(Cash Transaction Ban)
আইন
করে জনসমাগমস্থলে সরাসরি নগদ টাকা ভিক্ষা
দেওয়া এবং নেওয়া নিষিদ্ধ
করা হবে।
·
কেন?
নগদ টাকা লেনদেন বন্ধ
না হলে সিন্ডিকেটের হাত
ভাঙা সম্ভব নয়।
·
বিকল্প:
মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা হবে যেন
তারা নগদ টাকার বদলে
কার্ড বা কিউআর কোডের
মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ফান্ডে দান করে। আইন
অমান্যকারীকে (দাতার ক্ষেত্রে) প্রথমবার সতর্ক করা হবে।
৩.
সিন্ডিকেট ও মাফিয়াদের জন্য
কঠোর দণ্ড
ভিক্ষাবৃত্তির
পেছনে থাকা সিন্ডিকেটকে 'হিউম্যান
ট্রাফিকিং' (মানব পাচার) হিসেবে গণ্য করা হবে।
·
শাস্তি:
যারা শিশুদের অঙ্গহানি করে বা নারীদের
ব্যবহার করে ভিক্ষাবৃত্তির সিন্ডিকেট
চালায়, তাদের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড
এবং অর্জিত সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত
করার ধারা থাকবে।
·
প্রটেকশন:
এনজিও কর্মী বা যারা পুনর্বাসনে
কাজ করবে, তাদের ওপর হামলা হলে
তা 'রাষ্ট্রীয় কাজে বাধা' হিসেবে
বিশেষ দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার হবে।
৪.
ট্রাস্ট ও এনজিওর আইনি
সুরক্ষা
ফান্ড
ম্যানেজমেন্টে যেন কোনো দুর্নীতি
না হয়, সেজন্য এই
আইনের অধীনে একটি 'জাতীয় মর্যাদা
কাউন্সিল' গঠন করা হবে।
·
অডিট:
আন্তর্জাতিক অডিট সংস্থা এবং
ক্যাব (CAB) দ্বারা প্রতি বছর ফান্ডের স্বচ্ছতা
পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক হবে।
·
এনজিও
লাইসেন্স: কেবল সেই এনজিওগুলোই
কাজ করতে পারবে যাদের
স্বচ্ছতার রেকর্ড ভালো এবং যারা
নির্দিষ্ট স্কিল ট্রেনিং প্রদানে সক্ষম।
৫.
হিজড়া ও বিশেষ জনগোষ্ঠীর
কোটা
এই
আইনের একটি ধারায় থাকবে—
সরকারি ও বেসরকারি সকল
প্রতিষ্ঠানে নির্দিষ্ট শতাংশ আসন হিজড়া এবং
পুনর্বাসিত ভিক্ষুকদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।
·
ট্রাফিক
ও নিরাপত্তা: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে তাদের ট্রাফিক ভলান্টিয়ার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার একটি স্থায়ী আইনি
কাঠামো তৈরি করা হবে।
৬.
মাদকাসক্তদের বাধ্যতামূলক রিহ্যাবিলিটেশন
আইনের
মাধ্যমে পুলিশকে ক্ষমতা দেওয়া হবে যে, রাস্তায়
কোনো মাদকাসক্ত ভিক্ষুক পাওয়া গেলে তাকে সরাসরি
হাজতে না পাঠিয়ে 'মর্যাদা
রিহ্যাব সেন্টারে' পাঠাতে হবে। এটি কোনো
জেল নয়, বরং আইনি
বাধ্যবাধকতায় তাদের সুস্থ করার একটি প্রক্রিয়া।
সারসংক্ষেপ:
এই আইনের প্রভাব
যখন
এই 'মর্যাদা অ্যাক্ট'
কার্যকর হবে, তখন:
১. পুলিশ মাফিয়াদের ধরতে আইনি ভিত্তি
পাবে।
২. এনজিওগুলো আন্তর্জাতিক ফান্ড পাওয়ার জন্য একটি সরকারি
আইনি স্বীকৃতি পাবে।
৩. সাধারণ মানুষ আশ্বস্ত হবে যে তাদের
টাকা কোনো পকেটে নয়,
বরং একটি জাতীয় লক্ষ্য
পূরণে ব্যয় হচ্ছে।
সেলিব্রিটি ও ইনফ্লুয়েন্সার এনডোর্সমেন্ট: বাংলাদেশের মানুষ আইডল ফলো করতে
পছন্দ করে। যদি দেশের
শীর্ষ কোনো খেলোয়াড় বা
জনপ্রিয় ব্যক্তিরা এই কিউআর কোডে
টাকা দেওয়ার প্রচারণা চালায়, তবে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা
কয়েকগুণ বেড়ে যাবে।
আমাদের করণীয়: এখন সময় পরিবর্তনের!
আমরা
কি আজীবন এভাবেই জানালার কাঁচ তুলে দিয়ে
বা ১০ টাকার নোট
বাড়িয়ে দিয়ে দায় সারব?
নাকি একটি স্থায়ী সমাধান
গড়ব যেখানে কোনো মানুষকে আর
হাত পাততে হবে না?
‘প্রজেক্ট মর্যাদা’ কেবল একটি পরিকল্পনা
নয়, এটি আমাদের সম্মিলিত
অঙ্গীকার। এই পরিবর্তনের অংশ
হতে আপনি এখনই যা
করতে পারেন:
১. সচেতন হোন ও করুন: আজই প্রতিজ্ঞা করুন
রাস্তায় সরাসরি নগদ টাকা দেবেন
না। আপনার পরিচিতদের বোঝান যে, আপনার দেওয়া
১০ টাকা একজনের মাদক
কেনার বা সিন্ডিকেটের পকেট
ভারী করার সুযোগ করে
দিচ্ছে।
২. ‘দ্য মর্যাদা অ্যাক্ট’-এর দাবি তুলুন: আমরা এমন একটি
আইনি কাঠামো চাই যা ভিক্ষাবৃত্তিকে
নয়, বরং ভিক্ষুকের অসহায়ত্বকে
নির্মূল করবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই মাস্টারপ্ল্যানটি শেয়ার
করুন এবং নীতি-নির্ধারকদের
দৃষ্টি আকর্ষণ করুন।
৩. সিস্টেমে দান করার মানসিকতা গড়ুন: যখনই আমাদের সেন্ট্রাল
ফান্ড বা কিউআর কোড
গেটওয়ে চালু হবে, আপনার
যাকাত এবং দান সেখানে
প্রদান করুন। আপনার সামান্য কন্ট্রিবিউশন যখন আন্তর্জাতিক সংস্থার
‘ম্যাচিং ফান্ড’-এর সাথে যুক্ত
হবে, তখন তার শক্তি
হবে বহুগুণ।
৪. হিজড়া ও পুনর্বাসিতদের সুযোগ দিন: আপনার প্রতিষ্ঠান বা আশেপাশে পুনর্বাসিত
ব্যক্তিদের কাজের সুযোগ দিন। তাদের করুণা
নয়, মর্যাদা দিন।
আসুন, দয়া নয়— আমরা দায়িত্ব নিই। গড়ব এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে ‘ভিক্ষুক’ শব্দটি কেবল ইতিহাসের পাতায় থাকবে।
Comments
Post a Comment