বাংলাদেশে উগ্রবাদের নতুন রূপ
পশ্চিমা বিরোধিতা নাকি পশ্চিমা উগ্রবাদেরই ‘দেশি সংস্করণ’? এক গভীর
বিশ্লেষণ
বাংলাদেশে সাধারণত মনে করা হয় যে,
ইসলামপন্থী এবং পশ্চিমা বিশ্বের কট্টর ডানপন্থীদের অবস্থান উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর
মতো। একদিকে ইসলামপন্থীরা পশ্চিমা সংস্কৃতি ও সাম্রাজ্যবাদকে প্রত্যাখ্যান করে,
অন্যদিকে পশ্চিমা উগ্রপন্থীরা ইসলামবিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়া ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু
আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এই দুই আপাতবিরোধী গোষ্ঠীর চিন্তাধারা আসলে কতটা
কাছাকাছি?
২০২১ সালে প্রকাশিত আর্লিদ এঙ্গেলসন
রুদ ও মুবাশার হাসানের গবেষণা পত্র 'রেডিক্যাল রাইট ইন বাংলাদেশ' আমাদের
একটি ভিন্ন আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। তাদের দাবি অনুযায়ী, বাংলাদেশের
ইসলামপন্থীরা আসলে পশ্চিমা রেডিকেল রাইট বা উগ্র ডানপন্থীদেরই বাংলাদেশি ‘কাউন্টার
পার্ট’। তারা যেন একই মুদ্রার এপিট আর ওপিট। কেন এমনটা দাবি করা হচ্ছে? আসুন তিনটি
প্রধান স্তম্ভের ভিত্তিতে বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে বোঝা যাক।
১. ন্যাটিভিজম:
"বিশুদ্ধতা"র নেশা ও অপরকে বর্জন
ন্যাটিভিজম হলো এমন এক রাজনৈতিক ধারণা
যা একটি রাষ্ট্রকে কেবল একটি নির্দিষ্ট "শুদ্ধ" জনগোষ্ঠীর সম্পদ মনে
করে। পশ্চিমা বিশ্বে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থক বা হাঙ্গেরির ভিক্টর অরবানের মতো
নেতারা দাবি করেন যে, মুসলিম বা অভিবাসীরা তাদের শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিস্টান সংস্কৃতিকে
ধ্বংস করে দিচ্ছে। একে তারা বলেন 'গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট থিওরি'।
ঠিক একই মানসিকতা আমরা আমাদের দেশেও
দেখছি। এখানে একদল ইসলামপন্থী একটি "বিশুদ্ধ ইসলাম"-এর ধারণা প্রচার
করছে। তাদের মতে, যারা এই নির্দিষ্ট সংজ্ঞার বাইরে, তারা মুসলিমই নয়। এই "শুদ্ধিকরণ"
অভিযানে গত দেড় বছরে দেড়শ’র বেশি মাজার ভাঙচুর করা হয়েছে। আহমদিয়াদের অমুসলিম
ঘোষণার দাবি বা ভিন্নমতাবলম্বীদের ‘মুরতাদ’ তকমা দেওয়া—এসবই ন্যাটিভিজমের
বহিঃপ্রকাশ। পশ্চিমে তারা মুসলিমদের "বহিরাগত" বা হুমকি মনে করে, আর
এখানে ইসলামপন্থীরা নিজেদের ধর্মের ভিন্নমতাবলম্বীদের হুমকি মনে করে। লক্ষ্য
একটাই—বৈচিত্র্য মুছে দিয়ে একটি একরোখা পরিচয় চাপিয়ে দেওয়া।
২. লোকদেখানো
এলিট বিরোধিতা: একটি পরিকল্পিত কৌশল
রেডিকেল রাইটদের অন্যতম বড় অস্ত্র হলো
‘অ্যান্টি-এলিটিজম’ বা অভিজাত বিরোধিতা। তবে এই বিরোধিতার আড়ালে বড় ধরনের ভণ্ডামি
লুকিয়ে থাকে।
- পশ্চিমা উদাহরণ: ডোনাল্ড
ট্রাম্প বা ইলন মাস্কের মতো চরম ধনী ব্যক্তিরা নিজেদের "জনতার
চ্যাম্পিয়ন" হিসেবে দাবি করেন। তারা আক্রমণ করেন উদারপন্থী প্রফেসর,
সাংবাদিক বা বুদ্ধিজীবীদের। তাদের কাছে পুঁজিপতিরা এলিট নয়, বরং শিক্ষিত
প্রগতিশীলরাই হলো আসল শত্রু।
- বাংলাদেশি প্রেক্ষাপট:
আমাদের দেশের ইসলামপন্থীরাও একই পথ অনুসরণ করছে। তারা লিবারেল, বামপন্থী,
সেকুলার বুদ্ধিজীবী এবং গণমাধ্যমকে "এলিট" বা "পশ্চিমের
দোসর" হিসেবে চিত্রায়িত করে। অথচ যারা আসলে এদেশের আসল এলিট বা
সুবিধাভোগী পুঁজিপতি শ্রেণী, তাদের সাথে এই গোষ্ঠীগুলোর কোনো আদর্শিক সংঘাত
নেই।
তাদের এই এলিট বিরোধিতার মূল উদ্দেশ্য
হলো বাংলাদেশের নিজস্ব প্রগতিশীল সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে ‘পশ্চিমা উপনিবেশিকতা’ বলে
খারিজ করে দেওয়া। এটি কোনো বিপ্লব নয়, বরং বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজকে কোণঠাসা করার একটি
কৌশল মাত্র।
৩.
কর্তৃত্ববাদ: ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর খড়্গ
রেডিকেল রাইটদের তৃতীয় প্রধান
বৈশিষ্ট্য হলো কর্তৃত্ববাদ বা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ন্ত্রণ করার তীব্র
আকাঙ্ক্ষা। তারা ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বদলে সমাজ ও রাষ্ট্রে কঠোর শাসন চাপিয়ে দিতে
চায়।
পশ্চিমা ডানপন্থীরা যখন স্কুলের
পাঠ্যবই নিষিদ্ধ করে বা লিঙ্গীয় সমতার বিরুদ্ধে বল প্রয়োগ করে, তখন তাদের সাথে
আমাদের দেশের বই ছেঁড়া বা হিজরা নিয়ে আক্রমণ করা গোষ্ঠীগুলোর কোনো তফাত থাকে না।
পোশাক কী হবে, মানুষ কী পড়বে, কার বিশ্বাস কেমন হবে—সবকিছু তারা একটি কঠোর নৈতিক
ফ্রেমের মধ্যে বন্দি করতে চায়। ভয় দেখিয়ে একটি পুরুষতান্ত্রিক ও একমুখী
সমাজব্যবস্থা টিকিয়ে রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
আমাদের ভাবনার
সময় এসেছে
সবশেষে একটি প্রশ্ন থেকেই যায়: আমরা
যখন পশ্চিমের বিরোধিতা করছি, তখন কি আমরা আসলেই তাদের সাম্রাজ্যবাদ বা অন্যায়ের
প্রতিবাদ করছি? নাকি আমরা তাদের সমাজের সবচেয়ে কট্টর, সংকীর্ণমনা এবং উগ্র অংশটির
দেখানো পথেই হাঁটছি?
বাংলাদেশের ইসলামপন্থীরা পশ্চিমা
বিরোধী মুখোশ পরলেও তাদের কাজের ধরন, যুক্তি এবং ঘৃণা ছড়ানোর পদ্ধতিগুলো হুবহু
পশ্চিমা ইসলামোফোবিকদের মতোই। শত্রু আলাদা হলেও তাদের ঘৃণার ভাষা ও বিভাজনের
রাজনীতি একই। আমরা কি তবে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক সমাজ গড়ব, নাকি এই
‘আমদানিকৃত উগ্রবাদে’ নিজেদের ধ্বংস করব? সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে।
Comments
Post a Comment