বিপ্লবের ভেতরের বিভাজন: ফরাসি বিপ্লব থেকে শেখার শিক্ষা
আমার এই লেখাটাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি। কারণ ইতিহাস এখানে শুধু পুরোনো গল্প নয়—এটা আমাদের জন্য সতর্কবার্তা। আমি বারবার বলছি, আবারও বলছি—৫ আগস্টের পর ফরাসি বিপ্লব আমাদের সবারই পড়া উচিত। এখনো সময় আছে।
আমি স্পষ্টভাবে দেখছি, বাংলাদেশে বিপ্লবীদের ভেতরে ধীরে ধীরে দুটি ভাগ তৈরি হচ্ছে।
প্রথম ভাগটা হলো তারা,
যারা ভাঙচুর, আগুন দেওয়া, অফিস দখল—এই ধরনের কাজকেই বিপ্লব মনে করছে। তাদের কথা সহজ—রাষ্ট্র
অন্যায় করেছে, তাই রাগ দেখানোই ন্যায্য। তারা মনে করে, এই কাজগুলো না করলে চাপ তৈরি
হয় না। কিন্তু সমস্যা হলো, এই পথে নামলে অনেক সময় লক্ষ্য আর রাগ এক হয়ে যায়। তখন ক্ষতি
হয় এমন জায়গায়, যেখানে আসল অপরাধী নেই। আর এতে করে আন্দোলনের নৈতিক শক্তিটাই দুর্বল
হয়ে পড়ে।
এরপর আসে আরেকটা ভাগ।
তারা ভাঙচুর পছন্দ করে না। কিন্তু তাই বলে তারা বিপ্লববিরোধী না। তারা চায় আন্দোলনটা
টিকুক, মানুষ পাশে থাকুক। তাদের কথা—অন্ধ ভাঙচুর শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের বিরক্তি
বাড়ায়, শত্রুপক্ষকে সুযোগ দেয়, আর আন্দোলনের ক্ষতি করে।
কিন্তু এখানেই সবচেয়ে
বিপজ্জনক বিষয়টা শুরু হয়। এই দ্বিতীয় ভাগটা যখন বলে—“এই পথে যাওয়া ঠিক না”—তখনই তাদের
গায়ে “সুশীল” ট্যাগ লাগিয়ে দেওয়া হয়। যেন ভাঙচুরে না নামলেই কেউ দুর্বল, আপসকামী বা
বিপ্লবের শত্রু।
ইতিহাস বলে, এভাবেই বিপ্লব
ভেতর থেকে ভাঙে। ফরাসি বিপ্লবেও এমনটাই হয়েছিল। তখনও বিপ্লবীরা ভাগ হয়েছিল—Moderate
আর Radical। Radicalরা বলেছিল, “এখন প্রশ্ন করার সময় না।” আর যারা প্রশ্ন করেছিল, তারাই
ধীরে ধীরে শত্রু হয়ে গিয়েছিল।
এই পরিস্থিতি আরও ভয়ংকর
হয় যখন বাইরের চাপ আসে। বাংলাদেশের ওপরও এখন তেমন চাপ আছে। বিশেষ করে ভারত আমাদের দেশের
খুনিদের আশ্রয় দিচ্ছে, রক্ষা করছে—এটা বাস্তব। এই বাইরের চাপ Radical অংশকে আরও আক্রমণাত্মক
করে তোলে। তখন তারা ভেতরের ভিন্নমত সহ্য করতে চায় না।
কিন্তু ইতিহাস আমাদের
পরিষ্কার করে বলে—
রাগ দেখানো সহজ,
কিন্তু বিপ্লব টিকিয়ে
রাখা কঠিন।
যেদিন যুক্তিকে “সুশীলতা”
বলে গালি দেওয়া হয়,
সেদিন থেকেই বিপ্লব নিজের
ক্ষতি নিজেই করতে শুরু করে।
এই কারণেই ফরাসি বিপ্লব
আজও আমাদের জন্য জরুরি। কারণ বিপ্লবের সবচেয়ে বড় বিপদ অনেক সময় বাইরের শত্রু নয়—
বাইরের চাপে ভেতরের বিভাজন।
Comments
Post a Comment